পিরোজপুরের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য নেওয়া ৬০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্পে গুরুতর অনিয়ম ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় ৩১টি স্কিমে কোনো দৃশ্যমান কাজ না করেই প্রায় ৯০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ভ্যাট ও আয়কর বাদ দিলে আত্মসাতের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
পিরোজপুরের সাত উপজেলায় প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকা করার লক্ষ্যে ২০২১ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। সদর, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, ভান্ডারিয়া, কাউখালী, ইন্দুরকানি ও মঠবাড়িয়া উপজেলার দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করাই ছিল প্রকল্পটির প্রধান উদ্দেশ্য। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সরকারি নথিতে দেখানো অগ্রগতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রকল্পে মোট ২১৩টি প্যাকেজের মধ্যে বেশ কয়েকটির কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আবার ৩২টি প্যাকেজের অগ্রগতি শূন্য বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরেজমিনে কয়েকটি প্রকল্প এলাকা ঘুরে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিপিপিতে রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে সেসব কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ভান্ডারিয়া মহিলা কলেজ থেকে পূর্ব ভান্ডারিয়া মন্ত্রিবাড়ি রোড হয়ে খন্দকার বাড়ি সড়কে রাস্তা ও তিনটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু মাঠে নির্মাণকাজের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন না থাকলেও ওই প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
একইভাবে শ্রীপুর শিকদার হাট থেকে শ্রীপুর বলগার ব্রিজ সড়ক পর্যন্ত রাস্তা ও একাধিক কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকা এখনও কাঁচা বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই কাজের বিপরীতেও প্রায় ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
মাটিভাঙ্গা-কাঠালিয়া সীমান্ত সড়কসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে কাজের অস্তিত্ব না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সামান্য নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হলেও পরবর্তীতে কাজ এগোয়নি। এসব প্রকল্পের বিপরীতেও কোটি কোটি টাকা পরিশোধের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রায় ৪৪১ কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৭৭.৭৭ শতাংশ দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু ভুয়া প্যাকেজে অর্থ উত্তোলন ও প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ থাকায় এই অগ্রগতির হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্পের ৪৭টি প্যাকেজে বাস্তব কাজের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত বেশি বিল পরিশোধের অভিযোগও এসেছে। এসব অনিয়মের আর্থিক পরিমাণ পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মেজারমেন্ট বুক ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই জেলা পর্যায় থেকে বিল অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই বিল প্রক্রিয়াকরণের অভিযোগ তদন্তে এসেছে। বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অডিট আপত্তিতেও প্রকল্পটির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে মোট ১২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদিত ডিপিপির বাইরে অতিরিক্ত বরাদ্দ, বিধিবহির্ভূত ব্যয়, ভুয়া বিল এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের নামে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ থাকলেও অনেক এলাকার রাস্তার অবস্থা আগের মতোই নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, বর্ষায় কাঁচা সড়ক কাদায় পরিণত হওয়ায় মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের আওতায় রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও কাজ হয়নি। কোথাও সামান্য খোয়া বা ইট ফেলে কাজ শুরুর নমুনা তৈরি করা হলেও পরবর্তীতে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় প্রকল্প পরিচালকের পদে একাধিকবার পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে প্রকল্প অনুমোদনের পর কয়েকজন কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের আমলে বড় অঙ্কের অর্থ ছাড় ও ব্যয় হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, মাঠপর্যায়ের বিল প্রস্তুত ও কাজের তদারকির দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয়ের। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই কীভাবে অর্থ ছাড় হয়েছে, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে তারা জানিয়েছেন।
পিরোজপুরের বিভিন্ন এলজিইডি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে দুদক একাধিক মামলা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব মামলায় সাবেক জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। মামলাগুলো তদন্তাধীন এবং তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
দুর্নীতি ও আইনি জটিলতার কারণে বন্ধ থাকা উন্নয়নকাজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অসমাপ্ত কাজের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে নতুন প্রাক্কলন তৈরি এবং প্রয়োজন হলে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে কাজ শেষ করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রকল্পের কাজ শেষ করলেই হবে না; সরকারি অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কার অনুমোদনে ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। কাজ না করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রকল্পে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
