রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ২০৪টি এলাকাকে ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় সক্রিয় রয়েছে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ জন পেশাদার ছিনতাইকারী। ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে পথচারীদের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ডিএমপির হিসাবে, গত ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাই সংক্রান্ত ১৫৮টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে আরও। ফলে মামলা ও জিডির বাইরেও রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি শ্যামলীর একটি আবাসিক এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। গত ২৩ জুলাই ভোরে শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে মোটরসাইকেলে করে তিন ব্যক্তি এসে এক পথচারীর কাছে ঠিকানা জানতে চায়। কাছে যাওয়ার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে তারা। এ সময় আশপাশের লোকজনকে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই এলাকায় এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক মাস আগে একই কৌশলে এক পথচারীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পাশের ৪ নম্বর রোডেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বসবাস করলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন।
স্থানীয়দের মতে, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রবেশপথে গেট থাকা আবাসিক এলাকাতেও যদি ভোররাতে ছিনতাই ঘটে, তাহলে নগরীর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে রাতের শেষভাগ ও ভোরে জনসমাগম কমে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৫১টি ছিনতাই হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে বসিলা ৪০ ফিট, লাউতলা, গার্ডেন সিটির মুখ, ঢাকা উদ্যান নদীর ওয়াকওয়ে, হাক্কারপাড় ব্রিজ, রায়েরবাজার আজিজ খান রোড ও বোর্ডঘাট উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া মতিঝিল বিভাগে ৩২টি, মিরপুরে ২৭টি, রমনায় ২৫টি এবং গুলশানে ২১টি এলাকাকে ছিনতাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শুধু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেই থেমে নেই পুলিশ। ডিএমপি রাজধানীতে ১ হাজার ৩৮৭ জন পেশাদার ছিনতাইকারীর তালিকা তৈরি করেছে। তালিকায় সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারীর নাম রয়েছে ওয়ারী এলাকায়—৩০৮ জন।
এরপর উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকায় রয়েছে ২৪০ জন করে। মতিঝিল, লালবাগ ও রমনা এলাকাতেও দেড় শতাধিক করে ছিনতাইকারীর তথ্য পুলিশের তালিকায় রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের ধরতে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভাগভিত্তিক তালিকা সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে পাঠানো হয়েছে। নতুন কেউ ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনের আওতায় এলে তাকেও ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, তালিকাভুক্ত কেউ জামিনে কারাগার থেকে বের হলে তার তথ্যও সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে নজরদারির আওতায় রাখা হয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত পৃষ্ঠপোষক বা নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, একাধিক মামলা থাকার পরও কীভাবে অভিযুক্তরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ছিনতাই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজধানীতে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে রাতের শেষভাগ থেকে ভোর পর্যন্ত পুলিশের টহল বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে চিহ্নিত হটস্পটগুলোতে নিয়মিত নজরদারি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক থেকে আবাসিক গলি—বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও নজরদারি বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
