প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীনের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে আসীন রয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই দীর্ঘ শাসনামলে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বেইজিংয়ের অবস্থানকে তিনি সম্পূর্ণ এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক জীবন কখনোই মসৃণ ছিল না, বরং তার এই অবস্থান অর্জনের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর উত্থান-পতনের দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শি জিনপিং। তার বাবা শি ঝংজুন ছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কমিউনিস্ট বিপ্লবী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী। শৈশবে বিত্তবৈভব আর সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়েই কেটেছিল তার শুরুর দিনগুলো।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক মারপ্যাচে তার পরিবারের ওপর নেমে আসে খড়্গ। ১৯৬০-এর দশকে তার বাবাকে ‘দলবিরোধী’ ও ‘প্রতিবিপ্লবী’ চক্রের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত করে দল থেকে বহিষ্কার এবং গ্রামাঞ্চলের কারখানায় নির্বাসিত করা হয়।
পরিবারের এই বিপর্যয়ের প্রভাব গিয়ে পড়ে কিশোর শি-র ওপরেও। মাও সেতুংয়ের নির্দেশে তৎকালীন সময়ে লাখ লাখ তরুণের সঙ্গে তাকেও জোরপূর্বক পাঠানো হয় প্রত্যন্ত অঞ্চলে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে নামের এক পাহাড়ি গ্রামে দীর্ঘ সাতটি বছর কাটাতে হয় তাকে।
গুহা সদৃশ ইয়াওদং নামক বাসস্থানে থেকে তাকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয়েছে—মাঠে কৃষিকাজ করা থেকে শুরু করে ভারী সার বহন কিংবা নালা খননের মতো কাজ। পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছিলেন যে, চরম ক্ষুধা আর উকুনের উপদ্রবের মধ্য দিয়ে কীভাবে তাকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পাঠ নিতে হয়েছিল।
তবে এই প্রতিকূলতাই তাকে পরবর্তীতে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল। ২২ বছর বয়সে গ্রাম ছেড়ে বেইজিংয়ের মর্যাদাপূর্ণ চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। বাবার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পর ফুজিয়ান ও ঝেজিয়াংয়ের মতো উপকূলীয় ও অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত বর্ধনশীল প্রদেশগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে মূল রাজনৈতিক ধারায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন শি।
এই সময়কার বহু অনুগত কর্মকর্তা পরবর্তীতে তার বিশ্বস্ত রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রথমে প্রয়াত কূটনীতিকের কন্যা কে লিংলিংকে বিয়ে করলেও পরবর্তীতে খ্যাতিমান লোকসংগীত শিল্পী পেং লিউয়ানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
২০০৭ সালে সাংহাইয়ের শীর্ষ নেতার দায়িত্ব পালনের পর চীনের সর্বোচ্চ পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে প্রবেশ করেন এবং ২০১২ সালে হু জিনতাওয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার সাড়ে এক দশকের শাসনামলে চীন কেবল অর্থনৈতিকভাবেই শক্তিশালী হয়নি, বরং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতিতে গ্লোবাল সাউথের অবিসংবাদিত রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একই সঙ্গে হংকং, শিনজিয়াং এবং তিব্বতের অভ্যন্তরীণ নীতিতে কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সংবিধানে রাষ্ট্রপতির মেয়াদের সীমা তুলে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে করেছেন আরও পোক্ত।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শি জিনপিং সবসময়ই ব্যক্তিগত মোহ বা বন্ধুত্বের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার উষ্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা ভারতের নরেন্দ্র মোদীর মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কে নানামুখী কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেছে। এককালের সর্বস্ব হারানো সেই কিশোর আজ নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ইস্পাতকঠিন নেতৃত্বে বৈশ্বিক পরাশক্তির ভাগ্য নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছেন।
প্রতিবেদনটি বিবিসি গ্লোবাল চায়না ইউনিট থেকে নেওয়া ।
সান নিউজ / রাজীব
