রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শক্তিশালী আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) উদ্ধার এবং ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ স্টেশনে পরিত্যক্ত বস্তা ঘিরে বোমাতঙ্কের ঘটনার পরও স্টেশনগুলোতে দৃশ্যমান নিরাপত্তা জোরদারের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে যাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সোমবার রাজধানীর ফার্মগেট, আগারগাঁও ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীরা বড় ব্যাগ, বস্তা ও বিভিন্ন মালামাল নিয়ে নির্বিঘ্নে স্টেশনে প্রবেশ করছেন। প্রবেশপথে আনসার সদস্য ও এমআরটি পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাগ বা মালামাল তল্লাশি করা হচ্ছে না।
দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও এমআরটি পুলিশের কয়েকজন সদস্য জানান, সন্দেহজনক কিছু মনে হলে তল্লাশি করা হয়। তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী চলাচল করায় সবার ব্যাগ পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, বিমানবন্দরের মতো স্ক্যানিং যন্ত্র, পৃথক নিরাপত্তা অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত জনবল থাকলে শতভাগ তল্লাশি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তবে নিরাপত্তাকর্মীদের এই ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত নন যাত্রীরা। নিয়মিত মেট্রোরেলে যাতায়াতকারী মিরপুরের বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর মেট্রোরেলের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারকে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
আরেক যাত্রী তুলি আক্তার বলেন, সাম্প্রতিক বোমাতঙ্কের ঘটনায় নিয়মিত যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে দায়িত্ব পালনরত এমআরটি পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মুশফিকুর রহমান বলেন, সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে তল্লাশি করা হয়। তবে স্টেশনে হ্যান্ড ডিটেক্টর ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর স্ক্যানিং ব্যবস্থা না থাকায় নিয়মিত ব্যাগ পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না।
সচিবালয় মেট্রো স্টেশনের দায়িত্বে থাকা এমআরটি পুলিশের এক উপপরিদর্শক জানান, নিরাপত্তা জোরদারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু দেখলে তাৎক্ষণিক তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি আরও জানান, স্টেশনে থাকা আর্চওয়ে ও স্ক্যানার মেশিন বর্তমানে সচল নয়। সেগুলো পুনরায় চালুর কাজ চলছে।
ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের স্টেশন কন্ট্রোলার উজ্জ্বল আলী বলেন, নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব এমআরটি পুলিশ, আনসার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। স্টেশন কর্তৃপক্ষ মূলত সিসিটিভি ও যান্ত্রিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। তিনি জানান, যে স্থানে পরিত্যক্ত ব্যাগটি পাওয়া গিয়েছিল সেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। তবে স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থানের বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ স্টেশনে পাওয়া সন্দেহজনক ব্যাগ ও বস্তায় কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। কে বা কারা এসব বস্তু সেখানে রেখেছে, তা শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া আইইডির সঙ্গে ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ স্টেশনের সাম্প্রতিক ঘটনার কোনো যোগসূত্র এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মিরপুর-১০ স্টেশনে পান-জর্দার কৌটাসহ কিছু সাধারণ বস্তু এবং ফার্মগেটে আবর্জনাভর্তি একটি বস্তা পাওয়া গেছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জানতে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে প্রায় দেড় কেজি ওজনের টাইমারযুক্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আইইডি উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট। পরে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। এর ছয় দিন পর আশুলিয়ায় একটি ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর প্রেসার কুকারে রাখা আরেকটি আইইডি উদ্ধার করা হয়। এরপর ১ আগস্ট ফার্মগেট ও মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনে পরিত্যক্ত বস্তাকে কেন্দ্র করে বোমাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
সান নিউজ/ হুমায়রা
