বগুড়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কসাই রিপন ফকিরকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০৪ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।
মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের এসআই ফেরদৌস আলী সম্প্রতি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ প্রতিবেদন দাখিল করেন। আগামী ১০ আগস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণের বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
সোমবার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফেরদৌস আলী জানান, মামলার এজাহারে রিপন ফকির গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ থাকলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার শরীরে কোনো আঘাত বা গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এছাড়া নিহতের স্ত্রী মাবিয়া বেগম ও ভাইসহ একাধিক সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেছেন, রিপন ফকির পাউরুটি খাওয়ার সময় গলায় আটকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও একই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের বগুড়া ইউনিটের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল বাছেদ বলেন, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন। বাদী আপত্তি জানালে আদালতে নারাজি আবেদন দাখিলের সুযোগ থাকবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বগুড়া শহরের ঝাউতলা এলাকায় মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় রিপন ফকির গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন—এমন অভিযোগে তার স্ত্রী মাবিয়া বেগম একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সদর থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১০৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪০৪ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিদের নির্দেশ ও মদদে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম রিপন ফকিরকে গুলি করেন।
তবে মামলা দায়েরের পর নিহতের স্ত্রী মাবিয়া বেগম ও তার ভাই সাংবাদিকদের জানান, রিপন ফকির আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নয়, বরং পাউরুটি খাওয়ার সময় গলায় আটকে মারা যান। তাদের দাবি, সরকারি সহায়তা ও শহীদের স্বীকৃতি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের স্বাক্ষর নিয়েছিলেন এবং মামলার বিষয়ে তারা আগে কিছু জানতেন না।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ১১২ দিন পর, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর রিপন ফকিরের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা হয়। পরীক্ষা শেষে ধর্মীয় মর্যাদায় পুনরায় দাফন করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলাটি তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে তদন্ত করেন এবং মোট ২২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তদন্তে জানা যায়, এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সময় ঝাউতলা এলাকার অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ গুলির ঘটনা দেখেননি।
এছাড়া বাদীসহ সাতজন সাক্ষী, গোদারপাড়া এলাকার এক চা-দোকানি এবং রিপন ফকিরের জানাজায় ইমামতি করা স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের বক্তব্যেও গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা সবাই জানিয়েছেন, রিপন ফকির পাউরুটি খাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ২০২৫ সালের ২০ মার্চের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃতের শরীরে কোনো ধরনের ইনজুরির উল্লেখও পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের প্রাথমিক তালিকায় রিপন ফকিরের নাম থাকলেও চূড়ান্ত সরকারি গেজেটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে তার পরিবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে।
সান নিউজ/ হুমায়রা
