কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী-রৌমারী নৌপথে আবারও ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নাব্যতা সংকটের কারণে গত ১৪ আগস্ট থেকে এ পথে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন পণ্যবাহী যানবাহনের চালক ও শ্রমিকরা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে চিলমারী নৌবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় ঘাটে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন।
ফেরি চলাচল বন্ধের জন্য বিআইডব্লিউটিএর গাফিলতি ও নৌপথের চ্যানেল ড্রেজিংয়ে অবহেলাকে দায়ী করেছেন অপেক্ষমাণ চালক ও শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, যথাযথ নজরদারি ও নিয়মিত খনন না হওয়ায় প্রায়ই এই নৌপথে নাব্যতা সংকট দেখা দেয় এবং ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগে চিলমারী-রৌমারী নৌপথে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি সার্ভিস চালু হয় ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। শুরুতে দুটি ফেরির মাধ্যমে পণ্যবাহীসহ বিভিন্ন যানবাহন পারাপার করা হতো। প্রতি ট্রিপে ‘কুঞ্জলতা’ ফেরিতে ৮ থেকে ৯টি, ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ফেরিতে ১২ থেকে ১৩টি এবং ‘কদম’ ফেরিতে ৮ থেকে ৯টি পণ্যবাহী যান পারাপার করা সম্ভব ছিল।
এরই মধ্যে ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ও ‘কুঞ্জলতা’ ফেরি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শুধু ‘কদম’ ফেরিটি রয়েছে। তবে নাব্যতা সংকটের কারণে সেটিও গত ১৫ দিন ধরে চলাচল বন্ধ।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৭৪ দিনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে নাব্যতা সংকটের কারণে মোট ৫৪১ দিন ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল।
ভূরুঙ্গামারী থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকচালক মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ফেরি বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫টি ট্রাক ঘাট থেকে ফিরে গেছে। তিনিও ঘাটে এসে ফেরি বন্ধ দেখতে পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
রংপুর থেকে আসা ট্রাকচালক রবিউল ইসলাম বলেন, “৭ দিন ধরে ঘাটে আছি। ফেরি চালু হবে বলে শুনছি, কিন্তু এখনো চালু হয়নি। আজও যদি ফেরি না চলে, তাহলে অনেকটা পথ ঘুরে ঢাকায় যেতে হবে। এতে সময় ও খরচ—দুটিই বাড়বে।”
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আন্ধারমানিক’ নামে একটি শক্তিশালী ড্রেজিং মেশিন রয়েছে। সেটি দিয়ে নৌপথ খনন করা হলে সহজেই ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব। এতে মানুষের দুর্ভোগও কমবে।
বিআইডব্লিউটিসি চিলমারীর সহকারী ব্যবস্থাপক আকিব সোহেল আকাশ বলেন, রৌমারী ঘাট ও দুইশ বিঘা এলাকায় পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় ১৪ আগস্ট থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকায় ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। ১৫ আগস্ট ড্রেজিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরও দুটি ড্রেজার পাঠানোর অনুরোধ করা হলেও এখনো সেগুলো আসেনি। কয়েক দিন আগে রৌমারী ঘাট এলাকায় গিয়ে ড্রেজিংয়ের কাজ বন্ধ অবস্থায় দেখা গেছে। এভাবে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ড্রেজিংয়ের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর)-১০, চিলমারীর সমীর চন্দ্র পাল বলেন, রৌমারী ঘাট এলাকায় স্থানীয়দের বাধার কারণে ড্রেজিংয়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে শুধু দুইশ বিঘা এলাকায় খননকাজ চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ড্রেজিংয়ের কাজে স্থানীয়দের বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রৌমারী ঘাট এলাকার বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম, আনিছুর রহমান ও জাহিদসহ অন্যরা। তাদের দাবি, ড্রেজিংয়ের কাজে কেউ বাধা দেয়নি। কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই খননকাজ বন্ধ রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে এই রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখার চেষ্টা চলছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা এখানে ফেরি সার্ভিস চালু রাখতে আগ্রহী নন। ফেরি বন্ধ থাকলে নৌপথনির্ভর এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ফেরি সার্ভিস ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং জনদুর্ভোগ কমাতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
