দশ বছরে বিদেশি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে পাকিস্তানের। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। ২০১৫ সালে দেশটির মোট বিদেশি দেনা ছিল ৬৮ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে এসে তা ঠেকেছে ১৩৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। হিসাব করলে এক দশকে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ।
কার কাছে কত দেনা :
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের মোট বিদেশি ঋণ তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ১০৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার, সরকারি অথবা সরকারি গ্যারান্টির আওতাভুক্ত ঋণ। সরকারি গ্যারান্টি ছাড়া বেসরকারি খাতের ঋণ ১৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আর স্বল্প মেয়াদের ঋণ ১০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
এই হিসাবে মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশই সরকারের নিজের দায় অথবা সরকারের গ্যারান্টিতে নেওয়া। অর্থাৎ ঋণ শোধের চাপ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাঁধেই এসে পড়ছে।
একক দেশ হিসেবে শীর্ষে চীন :
ঋণদাতাদের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে রয়েছে চীন। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের কাছে দেশটির পাওনা ছিল ২২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। একক রাষ্ট্র হিসেবে এত বেশি অর্থ আর কেউ পায় না।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) কাছে পাকিস্তানের দেনা ১৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে দেনা ১৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার।

বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় ঋণের হিসাব :
ঋণদাতাদের ধরন ধরে হিসাব করলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর কাছে পাকিস্তানের দেনা ৫৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছে বকেয়া ৪২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
এই দ্বিপক্ষীয় অঙ্কের মধ্যে চীনের ২২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার ধরা আছে। চীন বাদে অন্য দেশগুলোর কাছে দেনা ১১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া একাধিক ঋণদাতার মাধ্যমে নেওয়া ঋণ রয়েছে ৮ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
বেসরকারি ঋণই আসল বিপদ :
পাকিস্তানের অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলছে বেসরকারি উৎস থেকে নেওয়া ঋণ। কারণ, এই ঋণের সুদ অনেক চড়া। ২০২৫ সালে সরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া নতুন ঋণে গড় সুদের হার ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সেখানে বেসরকারি ঋণদাতাদের ক্ষেত্রে সেই হার ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, প্রায় আড়াই গুণ।
সুদের সঙ্গে ফেরতের সময়েও বড় ফারাক :
শুধু সুদ নয়, ঋণ ফেরত দেওয়ার সময়ের দিক থেকেও দুই ধরনের ঋণের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। সরকারি ঋণের গড় মেয়াদ ১৬ বছর, আর কিস্তি শুরুর আগে চার বছরের ছাড় পাওয়া যায়। বেসরকারি ঋণের গড় মেয়াদ মাত্র তিন বছর, ছাড়ের সময়ও এক বছর।
এর ফল হলো দুই দিক থেকে চাপ। একদিকে অল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই টাকার ওপর বেশি হারে সুদও গুনতে হচ্ছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে :
বিদেশি ঋণের এই বাড়তি বোঝা পাকিস্তানের অর্থনীতির সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বহুপক্ষীয় সংস্থা ও চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে বেসরকারি ঋণের চড়া সুদ ও কম মেয়াদ দেশটির কোষাগারে চাপ বাড়াচ্ছে। এসব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ থাকাই স্বাভাবিক।
সান নিউজ / রাজীব
