তিস্তা নদীবেষ্টিত রংপুর বিভাগের দুর্গম ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘প্রভাতী’ প্রকল্পের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে এগিয়ে নিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন এলজিইডি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা।
তিস্তা অববাহিকার গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার বন্যাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, হাটবাজার উন্নয়ন, বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ‘অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন ও তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রভাতী প্রকল্পটি ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর অর্থায়নে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। বর্তমানে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার ২৫টি উপজেলায় প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, উন্নয়নকাজে স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। ঠিকাদারের পরিবর্তে স্থানীয় হতদরিদ্র মানুষকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দল হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব দলের প্রায় ৭০ শতাংশ সদস্য নারী। কাজ শুরুর আগে তাদের পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নির্মাণসামগ্রী ক্রয়, শ্রম ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক হিসাব-নিকাশসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন তারা।
কাউনিয়া উপজেলার খানসামা হাট নির্মাণের আগে মাইকিং করে স্থানীয়দের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পরে লটারির মাধ্যমে শ্রমিক নির্বাচন করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এতে উন্নয়নকাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় দরিদ্র মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে আয়-রোজগারের সুযোগ।
কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর, ভাইয়ারহাট, হারাগাছ ও মীরবাগ এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও হাটবাজার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গঙ্গাচড়া উপজেলায়ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও হাটবাজার উন্নয়নের কাজ চলছে।
সরেজমিনে কাউনিয়ার পল্লীমারী এলাকায় দেখা যায়, বন্যাপ্রবণ মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র। ভবনটিতে খাদ্য সংরক্ষণ কক্ষ, রান্নাঘর, কমিউনিটি ক্লিনিক, নারী-পুরুষের পৃথক টয়লেট এবং গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ভবনটি পল্লীমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক শায়লা সাঈদ বলেন, “ভবনটি অত্যাধুনিক। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নতুন বেঞ্চ, আলাদা টয়লেট এবং বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব সুবিধা রয়েছে। এটি এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ।”
স্থানীয় কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, “বন্যার সময় হামার সব ডুবি যায়। থাকার জায়গা থাকে না। এখন বড় একটা সুন্দর বিল্ডিং হইছে। গরু-ছাগল নিয়াও আশ্রয় নেওয়া যাবে।”
আরেক কৃষক মমিনুল মিয়া বলেন, “এই প্রজেক্ট হামার এলাকায় বাজার করছে, রাস্তা করছে। ছাওয়াগুলাক ট্রেনিং দিচ্ছে। এলাকার উন্নতি হইতেছে।”
এদিকে প্রকল্পের আওতায় দুই উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার বেকার যুবক ও যুব নারীকে ৪৫ দিনের আবাসিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। প্রশিক্ষণ শেষে অনেকে নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বন্যার পূর্বাভাস প্রচার, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গবেষণা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
ইফাদের কর্মসূচি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহ-সভাপতি ড. ডোনাল ফ্রান্সিস ব্রাউন বলেন, “প্রত্যন্ত এলাকায় এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র এবং অন্য সময়ে বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
এলজিইডি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা বলেন, “প্রভাতী প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বন্যাপ্রবণ এলাকায় টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজ করছি। বিশেষ করে নারী ক্ষমতায়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণে প্রকল্পটি ইতোমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষের কাছে উন্নয়ন শুধু রাস্তা বা ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ—সব মিলিয়েই টেকসই পরিবর্তন তৈরি হচ্ছে। আর এসব কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে এলজিইডি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার সক্রিয় ভূমিকা প্রকল্পের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হচ্ছে।
দীর্ঘদিন বন্যা, নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা তিস্তা অববাহিকার প্রান্তিক মানুষের জীবনে তাই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে দুর্গম জনপদের মানুষের জীবনমান আরও বদলে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি, তাজুল ইসলাম তুহিন, রংপুর ।।
