বাংলাদেশে পোশাক খাতে সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি এখন শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি একটি বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ব্যবসার খরচ কমাতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে চায় সরকার। এলডিসি উত্তরণকে মাথায় রেখে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এইচএন্ডএম গ্রুপ এবং বেস্টসেলারের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত পাইলট প্রকল্পগুলো প্রমাণ করেছে, টেক্সটাইল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রিসাইক্লিং পদ্ধতি আমাদের শিল্প ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে যুক্ত করা সম্ভব।
বুধবার (৬ মে) রাজধানীতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএর যৌথ উদ্যোগে সার্কুলার অর্থনীতি নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় সার্কুলার অর্থনীতিতে বিনিয়োগের আগ্রহ জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তারা জানায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশে এটি সহায়ক হবে।
‘বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পে সার্কুলার (বৃত্তাকার) রূপান্তর ত্বরান্বিতকরণ: সুইচ টু সিই পাইলট প্রকল্পসমূহ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাসমূহ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটির প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ইইউ জানায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশে এটি সহায়ক হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু ছোটখাটো পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পোশাক খাতে একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। বিশ্ববাজারে স্থায়িত্ব বা সাসটেইনেবিলিটি এখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেতা এবং বিনিয়োগকারীরা এখন এমন উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন যা একই সঙ্গে দক্ষ এবং দায়িত্বশীল।
তিনি আরও জানান, টেক্সটাইল এবং পোশাক খাত অত্যন্ত সম্পদ নিবিড় হওয়ায় এখানে উপকরণের পুনঃব্যবহার এবং রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা জরুরি। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষা করবে না, বরং আমাদের বৈশ্বিক অবস্থানকেও শক্তিশালী করবে। এই রূপান্তর সফল করতে সরকার, শিল্প খাত, গ্লোবাল ব্র্যান্ড এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা এবং স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ হারাবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার দেশের ভূখণ্ডকে বিনিয়োগের জন্য আরো আকর্ষণীয় করে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে লজিস্টিক খরচ জিডিপির বর্তমান ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত এইচ ই মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাটি থেকে সম্পদ আহরণ করে এমন পণ্য তৈরি করা বন্ধ করতে হবে যা আমরা ব্যবহার শেষে ল্যান্ডফিলে ফেলে দেই। এর পরিবর্তে আমাদের উচিত সেই সম্পদগুলো পুনরায় ব্যবহার করা। সম্পদ সাশ্রয় কেবল একটি পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি প্রবৃদ্ধি কৌশলও বটে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সার্কুলার ইকোনমির ক্ষেত্রে টেক্সটাইল ও পোশাক খাত আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ খাতে বর্জ্যরে পরিমাণ বিশাল ইউরোপীয় ইউনিয়নে বছরে ৫০ লাখ টনের বেশি পোশাক পরিত্যক্ত হয় এবং বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬ লাখ টন বর্জ্য তৈরি হয়। ফাস্ট ফ্যাশন এবং সামাজিক অবস্থার উদ্বেগের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২২ সালে টেকসই এবং সার্কুলার টেক্সটাইল কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইকো-ডিজাইন, বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট নিশ্চিত করার মতো উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্য। এছাড়া গত বছর আমরা করপোরেট স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করেছি, যা জবাবদিহিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।’
ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, এলডিসি উত্তরণ হলে স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। বিশেষ বাজার সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। লজিস্টিক খরচ কমিয়ে আনতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুর রহিম খান, বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খানসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সাননিউজ/আরএ
