এক নজরে
▌১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স
▌মোট ১৯৮টি দোকানের মধ্যে বন্ধের আগে চালু ছিল মাত্র ২৫টি
▌উড়ালসড়ক নির্মাণ, করোনা ও ক্রেতা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়ে মার্কেটটি
▌দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দার পর ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ ঘোষণা
▌১২৫ জন ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন বিপণিবিতানটির জায়গা বিক্রির উদ্যোগ
▌হাসপাতাল, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চলছে আলোচনা
▌কর্ণফুলী গ্রুপের নির্মিত এ মার্কেটের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত সাবের হোসেন চৌধুরী
রাজধানীর কাকরাইলে একসময় কেনাকাটার জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করা এই বিপণিবিতানে ঈদ-পূজা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবের আগে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত।
পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, গহনা, টেইলার্স ও খাবারের দোকানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ মার্কেট দীর্ঘদিন রাজধানীর অভিজাত ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের অন্যতম পছন্দের জায়গা ছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই জৌলুস হারিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে একসময়কার আলোচিত এই শপিং কমপ্লেক্স।
আজ সোমবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক বন্ধ। শাটারের ওপর টাঙানো একটি ব্যানারে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ১ অক্টোবর থেকে মার্কেটের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে। মূল শপিং কমপ্লেক্সে প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও ভবনের দুই পাশের কয়েকটি দোকান এবং একটি এটিএম বুথ তখনও চালু ছিল। ফুড কোর্টের কয়েকটি আউটলেটে হাতেগোনা কিছু ক্রেতার উপস্থিতি দেখা যায়।
১৯৯৮ সালে চালু হওয়া কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স ছিল ২০ তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারটি তলাজুড়ে বিস্তৃত। অবশিষ্ট অংশে ছিল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট। কর্ণফুলী গ্রুপের নির্মিত এ বিপণিবিতানে মোট ১৯৮টি দোকান ছিল, যার মালিকানা কিনে নিয়েছিলেন ১২৫ জন ব্যবসায়ী। একসময় প্রায় সব দোকান সচল থাকলেও ক্রেতা কমতে কমতে এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে বন্ধ ঘোষণার আগে মাত্র ২৫টি দোকান নিয়মিত ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল।
মার্কেটের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট ব্যবসাগুলোও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে দোকান ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। আবার কেউ কেউ এখনো মালিকপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বহু বছর ধরেই ক্রেতার সংকটে ভুগছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। আগে যেখানে প্রতিদিন শত শত ক্রেতার সমাগম হতো, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক সময় পুরো ফ্লোরজুড়ে কয়েকজন ক্রেতাও দেখা যেত না। দোকানের খরচ, সার্ভিস চার্জ ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের।
দোকানমালিক সমবায় সমিতির নেতাদের মতে, একাধিক কারণ মিলেই বিপণিবিতানটির এই পরিণতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণকাজের সময়। দীর্ঘদিনব্যাপী নির্মাণকাজ এবং তীব্র যানজটের কারণে কাকরাইল এলাকায় আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে অন্য মার্কেটমুখী হয়ে যায়।
সে সময় ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক দোকানমালিক আশপাশের বিভিন্ন বিপণিবিতানে অস্থায়ীভাবে দোকান স্থানান্তর করেন। কিন্তু উড়ালসড়ক চালু হওয়ার পরও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ আর আগের স্থানে ফিরে আসেননি। ফলে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির অনেক দোকান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে করোনা মহামারি বিপণিবিতানটির জন্য নতুন সংকট তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ব্যবসা স্থবির থাকায় বহু দোকান একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। শতাধিক দোকান মহামারির ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও অধিকাংশ দোকান পুনরায় চালু হয়নি।
শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা বা মহামারিই নয়, বিপণিবিতানটির ভাবমূর্তিতেও ধাক্কা লাগে। ব্যবসায়ীদের মতে, মার্কেটে থাকা কিছু প্রসাধনীর দোকানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ ওঠায় ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই প্রভাব পুরো মার্কেটের ওপর পড়ে এবং ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়।
দীর্ঘদিনের এই মন্দাবস্থার পর শেষ পর্যন্ত দোকানমালিকেরা সর্বসম্মতিক্রমে শপিং কমপ্লেক্সের কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে বিপণিবিতানের মালিকানাও বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি হাসপাতাল, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, শিগগিরই সম্পত্তি বিক্রির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
একসময় রাজধানীর অন্যতম পরিচিত শপিং গন্তব্য হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি এখন কার্যত তার শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেছে। নগর উন্নয়নের প্রভাব, ক্রেতার অভ্যাসের পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক মন্দা এবং করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপ মিলিয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে এক সময়ের প্রাণচঞ্চল এই মার্কেটের কোলাহল।
উল্লেখ্য, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি নির্মাণ করেছিল কর্ণফুলী গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। বর্তমানে মার্কেটটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চললেও একসময়কার জনপ্রিয় এই বিপণিবিতানের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আপাতত স্থায়ীভাবেই ইতি টানা হয়েছে।
সান নিউজ / রাজীব
