“আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন”—নয় বছরের শিশু তুলি পালের সরল এই আবদার ছুঁয়ে গেছে সবার হৃদয়। নিজের জন্য কিছু না চেয়ে শতবর্ষী, অসুস্থ ও দৃষ্টিহীন দিদির চলাফেরার কষ্ট কমাতে একটি ‘গাড়ি’ চেয়েছিল সে। তুলির সেই আবদার শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়েছে একটি হুইলচেয়ারে।
গতকাল নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে খালি গায়ে হাজির হয় তুলি। কারও কাছ থেকে শুনেছিল, ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। তাই নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে অসুস্থ দিদির জন্য হুইলচেয়ার চাইতে ছুটে আসে শিশুটি।
ইউএনও মো. মাসুদ রানার কাছে গিয়ে তুলি সরল কণ্ঠে বলে, “আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।” শিশুটির কথা শুনে তাকে কাছে ডেকে নেন ইউএনও। জানতে চান তার পরিবার ও দিদির কথা। আলাপের একপর্যায়ে উঠে আসে তাদের অভাব-অনটন ও নানা বঞ্চনার গল্প।
তুলি রায়পুরা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হরিপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বাবা নিরঞ্জন, ভাই মহাদেবসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকে। তার বাবা পেশায় জেলে। সংসারে অভাব নিত্যদিনের সঙ্গী। প্রায় তিন-চার বছর আগে মাকে হারিয়েছে তুলি।
তবে নিজের কষ্টের চেয়েও শতবর্ষী দিদির অসহায়ত্বই বেশি ভাবায় তাকে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দিদি চোখেও দেখতে পান না। হাঁটাচলাও প্রায় অসম্ভব। দিদিকে একটু স্বস্তিতে চলাফেরা করাতে হুইলচেয়ারের কথা শুনেই ইউএনওর কাছে ছুটে আসে তুলি।
সেদিন তুলির সঙ্গে ছিল তার ফুফাতো ভাই কৃষ্ণও। তার জীবনেও রয়েছে বঞ্চনার গল্প। কৃষ্ণের মা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে অন্যত্র চলে যাওয়ায় মায়ের স্নেহ থেকেও বঞ্চিত সে। দুই শিশুর জীবনের এই বাস্তবতা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।
তুলির কথা শুনে দেরি করেননি ইউএনও মো. মাসুদ রানা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তার দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি তুলি ও কৃষ্ণের জন্য নতুন পোশাকও কিনে দেওয়া হয়।
নতুন জামা পরে দিদির জন্য হুইলচেয়ার সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয় তুলি। তখন তার মুখে ফুটে ওঠে নির্মল আনন্দের হাসি। পরে উপজেলা প্রশাসনের কর্মীরা রিকশায় করে তুলি, কৃষ্ণ ও হুইলচেয়ারটি তাদের হরিপুরের বাসায় পৌঁছে দেন।
নিজের জন্য নতুন পোশাক পাওয়ার আনন্দের চেয়েও দিদির কষ্ট কিছুটা কমবে—এই ভাবনাই যেন তুলিকে বেশি আনন্দ দিয়েছে। তার হাসিতে ছিল প্রিয় মানুষটির জন্য কিছু করতে পারার তৃপ্তি।
ইউএনও মো. মাসুদ রানা বলেন, “তুলি পাল কারও কাছে শুনেছিল, ইউএনও অফিসে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। সেই আশায় খালি গায়ে হন্তদন্ত হয়ে তার দিদির জন্য হুইলচেয়ার চাইতে আমার কাছে আসে। এসে সরলভাবে বলে, ‘আমার দিদির জন্য গাড়ি দেন।’ পরে জানতে পারি, তার মা নেই এবং দিদি হাঁটতে পারেন না। বিষয়টি শুনে তার দিদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করি। একই সঙ্গে তার সঙ্গে আসা কৃষ্ণসহ দুজনের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “খালি গায়ে আসা দুই শিশু যখন নতুন জামা পরে দিদির জন্য হুইলচেয়ার নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়, তখন তাদের মুখে যে আনন্দ দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ। তাদের রিকশায় করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তুলির সেই মায়াভরা হাসি মনে রাখার মতো।”
স্থানীয়রা বলছেন, একটি হুইলচেয়ার হয়তো খুব বড় কোনো বিষয় নয়। কিন্তু নিজের প্রয়োজন ভুলে অসুস্থ দিদির জন্য নয় বছরের শিশুর করা এই আবদারের মানবিক মূল্য অনেক বেশি। তুলির সরল আবদারে সাড়া দিয়ে উপজেলা প্রশাসনও মানবিকতার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অভাবের মধ্যেও ভালোবাসা যে কমে যায় না, বরং কখনো কখনো শিশুর সরল আবদারেই তা সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পায়—তুলির গল্প যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
