পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় এখনও থামেনি উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করতে দিন-রাত কাজ করছেন উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও সহায়তার অভাবে জীবিত কাউকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে আসছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১৯ জনে। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি লা গুয়াইরা বন্দরে উদ্ধারকাজে এখনো বড় ভূমিকা পালন করছেন সাধারণ মানুষ। শাবল, কোদাল ও হাতুড়ির মতো সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে তারা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী দল কিংবা ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে না পারায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নতুন পরাঘাত, আতঙ্ক কাটছে না
সোমবার ভোরে আবারও একটি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে দেশটিতে। যদিও এতে নতুন করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে আতঙ্কে রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ।
এর আগে বুধবার উত্তরাঞ্চলের লা গুয়াইরা রাজ্যে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে প্রায় ৮০০টি ভবন ধসে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর থেকে পাঁচ শতাধিক পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে।
১০০ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার এক যুবক
বিপর্যয়ের মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছে একটি সফল উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় আরও জীবিত মানুষকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
‘দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ’
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই ভূমিকম্পকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, বর্তমানে ২৫ হাজারেরও বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করছেন। তার ভাষায়, এখন প্রতিটি জীবন রক্ষা করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিরাপত্তা মূল্যায়নে রঙভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় মানুষ ফিরতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা হবে। বাস্তুচ্যুতদের জন্য বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সরকারি সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন
ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, উদ্ধার অভিযানে সরকারি উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবক এবং কৃষকদের সরবরাহ করা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে দুর্গতদের।
যদিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তবুও উদ্ধারকাজে তাদের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা
জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিনদারো জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০টির বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অধিকাংশই সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ ১০ হাজার মৃতদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ সংগ্রহ করছে। এতে স্পষ্ট, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
