প্রথম আকাশে ওড়ার দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময় পার হলেও কিংবদন্তি যুদ্ধবিমান এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকনের অগ্রযাত্রা থামেনি। ১৯৭৪ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করা এই ফাইটার জেটটি সম্প্রতি প্রযুক্তির উৎকর্ষে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মরক্কোর বিমানবাহিনীর জন্য নির্মিত দুই আসনের সর্বাধুনিক সংস্করণ ‘ব্লক ৭২’ গত ৬ অক্টোবর প্রথমবারের মতো সফলভাবে আকাশে ওড়ে। দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রিনভিলে লকহিড মার্টিনের কারখানায় তৈরি এই যুদ্ধবিমানটি এখন ফ্লাইট টেস্ট বা উড্ডয়ন পরীক্ষার ধাপে প্রবেশ করেছে এবং ২০২৭ সাল থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মরক্কোর সঙ্গে হওয়া ২৫টি নতুন যুদ্ধবিমানের চুক্তির পাশাপাশি তাদের পুরোনো ব্লক ৫২ বিমানগুলোকেও এই সংস্করণে আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তির শীর্ষ ছোঁয়া: ব্লক ৭২-এর অসাধারণ বৈশিষ্ট্য
নতুন ব্লক ৭২ সংস্করণটিকে এখন পর্যন্ত তৈরি করা সবচেয়ে উন্নত এফ-১৬ কনফিগারেশন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এতে যুক্ত করা হয়েছে সর্বাধুনিক অ্যাভিওনিক্স, অত্যাধুনিক এএন/এপিজি-৮৩ এএসিএসএ রাডার এবং ভাইপার শিল্ড ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট। শক্তিশালী এই রাডার ব্যবহারের ফলে পাইলট অনেক দূর থেকে শত্রুর লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারেন এবং নিখুঁত তথ্য পেতে সক্ষম হন। এছাড়া ভাইপার শিল্ড সিস্টেমটি যেকোনো শত্রুর রাডার ও ইলেকট্রনিক হুমকি নিমিষেই প্রতিহত করতে পারে। ইঞ্জিনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ বৈচিত্র্য; এই সংস্করণে প্র্যাট অ্যান্ড হুইনির শক্তিশালী ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের সামরিক চাহিদা মেলাতে দারুণ কার্যকর।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে এফ-১৬-এর জন্ম
এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের পেছনের ইতিহাসটি জড়িয়ে আছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ের বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতার সঙ্গে। সে সময় মার্কিন বিমানবাহিনীর পাইলটরা অনুধাবন করেছিলেন যে, শুধু ভারী ও বিশাল যুদ্ধবিমান দিয়ে আকাশযুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটেই মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্নেল জন বয়েড গণিতবিদ থমাস ক্রিস্টির সঙ্গে যৌথভাবে ‘এনার্জি-ম্যানুভারেবিলিটি থিওরি’ বা শক্তি-কৌশল তত্ত্ব তৈরি করেন। তাদের মূল ভাবনা ছিল—ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমান হতে হবে আকারে ছোট, হালকা এবং অত্যন্ত দ্রুত দিক ও গতি পরিবর্তনক্ষম, যার থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও হবে অনেক বেশি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া সেই পরিকল্পনা পরবর্তীতে এফ-১৬-এর নকশার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
ফাইটার মাফিয়া ও ঐতিহাসিক নকশা দর্শন
১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে কর্নেল বয়েডের চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসেন একদল প্রতিরক্ষা সংস্কারক, যারা পরবর্তীতে ‘ফাইটার মাফিয়া’ নামে পরিচিত হন। ১৯৬৯ সালে পেন্টাগন থেকে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার পর জেনারেল ডায়নামিক্স এবং নর্থরপ কোম্পানি এই বিশেষ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধবিমানের নকশা নিয়ে কাজ শুরু করে। বিমানটির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে এটি প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে অসাধারণ ম্যানুভারেবিলিটি বা চটপটে গতি নিশ্চিত করতে পারে। গত পাঁচ দশক ধরে এই মূল ডিজাইনটিকে ঘষামাজা করেই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একের পর এক উন্নত সংস্করণ তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে আকাশ শাসন ও স্থায়ী প্রাসঙ্গিকতা
এফ-১৬-এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে এর আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তায়। আমেরিকার বাইরে বর্তমানে ২৬টি দেশের বিমানবাহিনী এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফিক্সড-উইং সামরিক বিমান, যার প্রায় ২ হাজার ১০২টি যুদ্ধবিমান এখনও সক্রিয়ভাবে আকাশে পাহারায় রয়েছে। বিশ্বজুড়ে মোট সক্রিয় কমব্যাট এয়ারক্রাফ্টের প্রায় ১৫ শতাংশই এই পরিবারের অন্তর্গত। স্টেলথ প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগেও হালকা ওজন, সহজে আধুনিকায়নযোগ্য এয়ারফ্রেম এবং দুর্দান্ত অভিযোজন ক্ষমতার কারণে এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন আজও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য যুদ্ধবিমান হিসেবে নিজের অবস্থান অটুট রেখেছে।
সান নিউজ / রাজীব
