সঠিক তথ্য পাওয়া আর মূল্যবান সম্পদের মালিক হওয়া একই কথা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র-সবার জন্যই সঠিক তথ্য অপরিহার্য, কারণ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য তথ্য। বিপরীতে, ভুল, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। ইতিহাস, রাজনীতি, গবেষণা, সাংবাদিকতা, ব্যবসা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা-প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য একটি কৌশলগত সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়। এ কারণেই বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বলা হয়, ‘তথ্যই শক্তি’।
তথ্যের অভাবে ঘটে যায় মহাবিপর্যয় : গোয়েন্দা সংস্থা প্রদত্ত তথ্য এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে পাওয়া তথ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে অথবা যাচাই-বাছাই না করার কারণে বাংলাদেশে ১৯৮১ সালে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছিল। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সাংগঠনিক কোন্দল নিরসন করার জন্য ১৯৮১ সালের ২৯ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীরউত্তম) চট্টগ্রামে যান। তথ্য দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রামে না গেলে বিএনপি ভেঙে যেতে পারে। তবে ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরে গোপন রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রামে অবস্থানরত পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মনজুরকে ২৬ মের দিকে ঢাকায় কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি করা হয়। বদলির আদেশ পেয়ে জেনারেল মনজুর রাগে-ক্ষোভে বাঘের মতো ফুঁসতে থাকেন। বাঘের মুখে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াকে ১৯৮১ সালের ২৯ মে চট্টগ্রামে কেন নেওয়া হলো, তা এখনো পর্যন্ত বড় এক এনিগমা (ধাঁধা) হয়ে আছে। পরদিন, ৩০ মে ১৯৮১-এর ভোরে রাষ্ট্রপতি জিয়ার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে ঢাকায় বদলি আদেশপ্রাপ্ত (তখনো পর্যন্ত চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানরত) মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের নেতৃত্বে সংঘটিত সেনা বিদ্রোহে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে চট্টগ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করলে অথবা ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো।
ইমদু উপাখ্যান : ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থী ড. কামাল হোসেনকে ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরাজিত করে বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিজয়ী হয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তার কেবিনেটের যুব প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমের মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন থেকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইমদাদুল হক ইমদুকে গ্রেফতার করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল মতিনের নির্দেশে। ইমদু ছিলেন একাধিক হত্যা মামলার আসামি এবং সে সময়ের অন্যতম আলোচিত সন্ত্রাসী। এ ঘটনা ছিল শেষের শুরু, অর্থাৎ তৎকালীন বিএনপি সরকারের শেষ সময়। ইমদুকে খবর দেওয়া হয়, যুব প্রতিমন্ত্রী তাকে বাসায় ডেকেছেন। অথচ মন্ত্রী তখন বাসায় ছিলেন না। অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ এসে ইমদুকে গ্রেফতার করে। ইমদু যদি তথ্য যাচাই করতেন অথবা যুবপ্রতিমন্ত্রী আগেই তথ্য পেতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। তবে এ ঘটনার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে। তিন দিন পর রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এ মন্ত্রিসভায় বিতর্কিত যুব প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মন্ত্রিসভায় বাদপড়া এবং অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রাষ্ট্রপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন মূল বিএনপির সঙ্গে বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার মতবিরোধ তীব্র হয়। বিক্ষুব্ধ এসব নেতা তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সামরিক শাসন জারির জন্য গোপনে উসকানি দিতে থাকেন। দেশব্যাপী গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়, সামরিক শাসন জারি করা হচ্ছে। সাত্তার সরকারের কাছে এ সম্পর্কিত তথ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। কারণ, তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি আগে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
ষড়যন্ত্র : ১৯৯১-৯৬ সময়কালে বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাকালে গোপনে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে কিছু নেতা অবস্থান নেওয়ার ফলে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেন; যার প্রভাব নির্বাচনে পড়ে এবং আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপির যেসব নেতা একসময় ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন, তাদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল না বলে অনেকেই আবার ২০০১ সালে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
১/১১ : ২০০৬-এর নির্বাচনের পূর্বে ক্ষমতাসীন বিএনপির কয়েকজন মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতা পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নতুন দল গঠন করলে ২০০৭ সালে ১/১১-এর কুশীলবরা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বিএনপিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। তারা বিএনপির ভেতরে একটি ‘সংস্কারপন্থি’ ধারা গড়ে তোলেন। এ ধারার সঙ্গে বিএনপির দ্বন্দ্বের অবসান হলেও এর প্রভাবের কারণে বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে ২০ বছর সময় লেগে যায়।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি : ২০২৬-এ বিএনপি ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মাথায় দলের অভ্যন্তরের অবস্থা গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে, যা শুধু অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে’র রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের ‘একদফা’ ঘোষণা বিষয় নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে হট্টগোল ও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে, তার কোনো তথ্য কেউ দিতে পারেনি সরকারের কাছে। প্রামাণ্যচিত্রে ২০২৪ সালের ৩ আগস্টের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ছাত্র-জনতার ঘোষণা করা মূল ‘একদফা’ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবদান বাদ দিয়ে তারেক রহমানকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে একদফার ঘোষক হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ছাত্রনেতারা। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে এক ছাত্রনেতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হট্টগোলের সময় আমন্ত্রিত বিদেশি কূটনীতিক এবং ছাত্ররা সভাস্থল ত্যাগ করলে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল রয়েছে। প্রথম যে বিষয়টি দেখেছি, সেখানে আবু সাঈদের ছবি নেই। আবু সাঈদ এ গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীক। তার ছবি না থাকলে এটি কোনো ডকুমেন্টারি হতে পারে না। খালেদা জিয়ার ছবিও সেখানে থাকা উচিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে কী ঘটতে যাচ্ছে অথবা কী ঘটতে পারে, তার কোনো তথ্য সরকারের কাছে কেন নেই, সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
উন্নয়নের স্লোগান: পুরোনো বিড়ম্বনার নতুন করে উত্থান : শুধু উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায় না-জেনারেল এরশাদ ৯ বছর শাসন করার পর উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারেননি, শেখ হাসিনাও সাড়ে পনেরো বছর শাসন করার পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কারণ তারা সঠিক রাজনীতি নির্ধারণ করতে পারেননি এবং তাদের কাছে গণতথ্য ছিল না। রাষ্ট্রপতি জিয়া জাতির সামনে সঠিক রাজনীতি নিক্ষেপ করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতিমুক্ত থেকে পাঁচ বছর উন্নয়ন করেছিলেন, যা জাতি এখনো মনে রেখেছেন। একজন জাতীয়তাবাদী কখনো দুর্নীতিবাজ হতে পারে না। কারণ জাতীয় স্বার্থ মাথায় রাখলে দুর্নীতি করা যায় না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে এবং নড়বড়ে করে দিয়ে গেছে সবকিছু। নড়বড়ে খুঁটি ধরে বর্তমান স্নায়ুযুদ্ধের টর্নেডো থেকে বাঁচা যাবে না। বাঁচতে হলে দরকার সোজা শক্ত খুঁটি-সে খুঁটি হলো নিজ দল ও বিভিন্ন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী এবং জনগণ। দেশ এবং সরকারকে বাঁচাতে হলে দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের থেকে তথ্য নিতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন হয় সরকার এবং দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করা। দেশ চালাতে হয় গণতথ্যের ওপর ভিত্তি করে, যার জন্য জনগণের সঙ্গে মিশতে হয়, বন্ধুত্ব করতে হয়। চাটুকারদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলে খাদে পড়তে হয়, যার উদাহরণ হলো শেখ হাসিনা।
লেখক : মেজর (অব.) মনজুর কাদের: সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ-সদস্য
