দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে নতুন করে বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। কোথাও নির্ধারিত সময়ের বাইরে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গ্রাম ও মফস্বল এলাকার মানুষ। কোনো কোনো অঞ্চলে দিনের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎহীন থাকছে। ফলে ঘুম, পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র শিল্পের উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। দিন ও রাত মিলিয়ে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। অনেক এলাকায় রাতভর কয়েক দফায় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে। ফলে প্রচণ্ড গরমে অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না।
কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলীর মতো নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি। রাতে ঘুম না হওয়ায় সকালে কাজে যেতে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন তারা। অথচ দিনমজুরদের ক্ষেত্রে একদিন কাজ বন্ধ থাকলেই পরিবারের আয় কমে যায়।
কালীগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বড় ব্যবধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্থানীয় নেসকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট।
ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। লালমনিরহাটের কাকিনা বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রনির্ভর ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আইসক্রিম, কোমল পানীয়সহ বিভিন্ন ঠান্ডা ও দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য সংরক্ষণে সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে পণ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ।
শুধু দোকানপাট নয়, বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্প ও উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানও বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়ামের সামনে টেস্ট পরীক্ষা। কিন্তু রাতের লোডশেডিংয়ের কারণে নিয়মিত পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মোমবাতি বা কুপির আলোয় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
ফেনীর দাগনভূঞাতেও লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি ভয়াবহ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে না।
প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিছু এলাকায় এই সময় বেড়ে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক গ্রাহক অভিযোগ জানাতে বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র কিংবা অভিযোগকেন্দ্রে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
ফেনী অঞ্চলের পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চাহিদার তুলনায় তারা অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছেন। এ কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাভাবিক সময়ে যেখানে কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং করা হতো, বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে তা অনেক বেশি সময় ধরে করতে হচ্ছে। তাপমাত্রা আরও বাড়লে লোডশেডিংয়ের সময়ও বাড়ছে।
মাদারীপুরে শহর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন কারখানায়ও। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কাজের গতি কমে যাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মঘণ্টাও কমছে।
মাদারীপুরের একটি ছাপাখানার মালিক রুবেল মাতুব্বর জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। এতে গ্রাহকদের অসন্তোষের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুরে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১১ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ১০৬ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ, চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান অনেক বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং ভাগ করে দিতে হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান। প্রচণ্ড গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে।
অন্যদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর ফলে তীব্র গরম ও বিদ্যুৎহীনতা একসঙ্গে জনজীবনে দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
