দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা অত্যাধুনিক এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমানের প্রথম দুটি চালান হাতে পেয়েছে তাইওয়ান। আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর) স্থানীয় সময় দুপুরে যুদ্ধবিমান দুটি তাইওয়ানের পার্বত্য পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের তাইতুং জেলার ঝিহাং বিমানঘাঁটিতে সফলভাবে অবতরণ করেছে। ২০১৯ সালে তাইওয়ান সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই মেগা সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতা ও সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিগত বছরগুলোতে তাইপের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। অবশেষে এই যুদ্ধবিমানের আগমন দ্বীপরাষ্ট্রটির আকাশসীমা সুরক্ষায় নতুন গতি আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীন থেকে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা সামরিক আগ্রাসন ও হুমকির মুখে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলাই তাইওয়ানের এই বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। বেইজিং এই স্বশাসিত দ্বীপকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করলেও তাইপে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর। এর আগে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অস্ত্র সরবরাহে বারবার দেরি হওয়ায় তাইওয়ানিজ মহলে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মাঝে এই অস্ত্র সরবরাহ তাইওয়ানের আত্মবিশ্বাস কিছুটা হলেও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক উচ্ছ্বসিত বার্তায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এই ঘটনাকে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পথে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি, এই কঠিন সময়ে তাইওয়ানের পাশে থাকার জন্য তিনি মার্কিন মিত্রদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, তাইপের সংসদে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রথম চালানের পর খুব দ্রুতই আরও বেশ কিছু এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান তাইওয়ানের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে, যদিও তিনি গোপনীয়তার খাতিরে এর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা সংখ্যা প্রকাশ করেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালে লকহিড মার্টিনের তৈরি ৬৬টি সর্বাধুনিক এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্য প্রায় আট বিলিয়ন বা আটশ কোটি মার্কিন ডলারের এই চুক্তি অনুমোদন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই নতুন চালানগুলো যুক্ত হওয়ার ফলে বর্তমানে তাইওয়ানের হাতে থাকা এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের মোট সংখ্যা দুইশ পেরিয়ে গেল, যা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাকে দক্ষিণ এশিয়া ও তাইওয়ান প্রণালীতে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। তবে সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনে জটিলতা এবং বিশ্বজুড়ে খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহে ঘাটতির কারণে মূলত মূল সময়সূচির চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছিল এই প্রকল্প।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ঠিক এক সপ্তাহ পরেই তাইওয়ানের মাটিতে এই যুদ্ধবিমানগুলোর অবতরণ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। গত মে মাসে বেইজিংয়ে দুই নেতার সাক্ষাতের পর ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় এক হাজার চারশো কোটি ডলারের একটি সামরিক সহায়তা প্যাকেজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখলেও, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আবার এগারোশ কোটি ডলারের আরেকটি পৃথক প্যাকেজ অনুমোদন করেছিলেন। তাছাড়া, বর্তমান এই সরবরাহ কেবল তাইওয়ানের সামরিক শক্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দ্বন্দ্বে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকেও নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে।
সান নিউজ/রাজীব
