ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ও বেনজির দৃশ্য দেখা গেল। দেশের তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জির আন্দোলন দমাতে কেন্দ্র সরকার যে ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে, তা এর আগে কখনো দেখেনি দেশবাসী।
মোদি প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি দল যে এই আন্দোলন নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে, তা দিল্লির রাজপথে মোতায়েন করা বিশাল পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর বহর থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রেকর্ড সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী ও কঠোর কড়াকড়ি
শুক্রবারের শেষ রাত থেকেই আন্দোলনকারীদের যেকোনো মূল্যে রুখতে মাঠে নেমে পড়েছিল প্রশাসন। সরকারের প্রাথমিক হিসাব ছিল প্রায় বিশ হাজার তরুণ এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন। তাদের মোকাবিলা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে প্রায় তেতাল্লিশ হাজার নিরাপত্তা কর্মী প্রস্তুত রাখা হয়, যার মধ্যে শুধুমাত্র শনিবারই মাঠে নামানো হয় পঁয়ত্রিশ হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য।
কেন্দ্রীয় প্রশাসনের একটাই নির্দেশ ছিল, যন্তর মন্তরের চারপাশের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে যেন কোনোভাবেই আন্দোলনকারীরা প্রবেশ করতে না পারে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে প্রশাসন নজিরবিহীন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
যন্তর মন্তরের ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের পুরো এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয় এবং পরিস্থিতি সংবাদমাধ্যমের নজরদারির বাইরে রাখতে সকাল থেকেই ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এর ফলে মাঠপর্যায় থেকে কোনো ধরনের লাইভ সম্প্রচার বা সরাসরি আপডেট পাওয়া একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পরিবহন ব্যবস্থাও পুরোপুরি স্থবির করে দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের আগের ঘোষণা অনুযায়ী দিল্লির মেট্রোর প্রায় পঁয়ত্রিশটিরও বেশি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি রেল মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দুপুর পর্যন্ত দিল্লির উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বা দিল্লি থেকে ছাড়ার কথা ছিল এমন প্রায় আড়াই শ ট্রেন বাতিল করা হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল, মেস ও সন্দেহজনক আবাসিক এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে আগে থেকেই পুলিশ বহু মানুষকে সতর্ক ও হুমকি দিয়ে রেখেছিল।
শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও ইউটিউবারদের ওপর কড়াকড়ি
সরকারের ভয়ের মূল কারণ ছিল গত জুন-জুলাইয়ের গণবিক্ষোভ, যা তৎকালীন সময় প্রশাসনের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি বিশাল আকার ধারণ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাই এবার সরকারকে এত কঠোর হতে বাধ্য করেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মূল মুখ অভিজিৎ দিপক, আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাসের মতো নেতারা আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে তাদের যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে দেওয়া হবে না। বেঙ্গালুরুতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তাঁরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন—পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করলেও যেন তরুণ সমাজ আন্দোলন চালিয়ে যায়।
তাদের সেই আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়। শনিবার সকালেই গুড়গ্রামের নিজ বাসভবন থেকে জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করে পুলিশ। জার্মানি থেকে ফিরে যিনি এই তরুণদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছিলেন, তাকেও গৃহবন্দী বা আটক করার মধ্য দিয়ে সরকারের কঠোর মনোভাব ফুটে ওঠে।
এরপর সিজেপির ত্রিমূর্তি অভিজিৎ, আশুতোষ ও সৌরভ উড়োজাহাজে করে দিল্লি বিমানবন্দরে পা রাখতেই পুলিশ তাদের বিমান থেকে নামার সুযোগ না দিয়েই সরাসরি হেফাজতে নেয়।
রাজনৈতিক তরজা ও সরকারের সাফাই
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’ জোট এবং অন্যদিকে সিজেপির এই দুইমুখী চাপে মোদি সরকার কোণঠাসা।
সরকার ও শাসকদল বিজেপি এই পুরো আন্দোলনকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। দলীয় সভাপতি নিতিন নবীন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের ভিত্তিকে দুর্বল করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে তারা বদ্ধপরিকর।
সেই উদ্দেশ্যে যন্তর মন্তরের আশপাশে শাসকদলের বিশ্বস্ত সমর্থকদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
দুপুর নাগাদ দিল্লির পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে যন্তর মন্তর চত্বর সম্পূর্ণ ফাঁকা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যদিও এর মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঁচ শতেরও বেশি তরুণকে আটক করা হয়েছে। কঠোর পাহারা আর নজিরবিহীন এই ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে আপাতত রাজধানীর প্রতিবাদ কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করেছে প্রশাসন।
সান নিউজ / রাজীব
