দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। ২০০৭ সালের পর অর্থাৎ গত ১৯ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাসের হার। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। আর সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।
২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কমার পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। ফলে এসব বোর্ডে সম্মিলিত পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্য বেশি। মোট ৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৩ জন ছেলে পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮১৪ জন। ছেলেদের পাসের হার ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৭৬ জন মেয়ে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৭৯৬ জন। মেয়েদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৪৭ হাজার ৩০৪ জন ছেলে এবং ৫৮ হাজার ৭০৫ জন মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফলে পাসের হার এবং জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল আরও পিছিয়ে রয়েছে
এবার দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষাতেও ফলাফল সন্তোষজনক হয়নি। মোট ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৭৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন। অনুপস্থিত ছিল ৭ হাজার ২১৫ জন।
অংশ নেওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৪ হাজার ৪৭০ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৫৩ হাজার ৪৯৪ জন। সব মিলিয়ে কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন।
এসএসসি ও সমমানের গত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করলে এবারের অবনতির মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়
২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে এই হার বাড়ে। ২০১৪ সালে তা ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়।
২০১৭ সালে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড প্রয়োগের পর পাসের হার কমে ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। এরপর করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
২০২১ সালে বিষয় ম্যাপিং ও বিশেষ মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশের কারণে পাসের হার বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি।
করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পরীক্ষা এবং পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে আসার পর পাসের হার আবার নিম্নমুখী হয়। ২০২৫ সালে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমেছিল। এবার সেটি আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে।
গণিত-ইংরেজিতে দুর্বলতা বড় কারণ
এবারের ফলাফলে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই দুই মৌলিক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক পাসের হারেও বড় প্রভাব পড়েছে।
এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা গ্রহণ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়টিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, ফলাফল কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হবে না। বরং কোন বিষয়ে এবং কোন স্তরে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি রয়েছে, সেটি শনাক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এসএসসি ফলাফলের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলেও। এ বছর শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে ৬৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে।
অন্যদিকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন শূন্য পাস বা জিরো পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩১২টি। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান মনে করেন, শুধু পাসের হার কমেছে—এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে এবারের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে চলবে না।
তার মতে, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে পড়েছে এবং কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ফলাফল খারাপ হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে পাঠদানের মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া এবং নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করার কারণে এবারের ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার ঘাটতিও সামনে এসেছে।
ফল ভালো দেখানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা যাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেটিকেই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
খারাপ ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, এবারের ফলাফল মাধ্যমিক শিক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা বিভিন্ন দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। তাদের মতে, কেবল পাসের হার বাড়ানোর চেষ্টা না করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সক্ষমতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নানা সমস্যার প্রভাব এবারের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত পড়াশোনার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি এবং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এখনও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। মোবাইল ও ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাব, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং আর্থিক নানা সমস্যাও অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় প্রভাব ফেলছে।
ফলে যারা নিয়মিত পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের ফল তুলনামূলক ভালো হয়েছে। বিপরীতে পড়াশোনা থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হয়েছে।
গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা নতুন কোনো বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন ড. জিন্নাহ। তার মতে, প্রতিবছর একই সমস্যা সামনে এলেও শুধু ফলাফল প্রকাশ ও মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না।
এ জন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোকে গণিত ও ইংরেজির শিক্ষকদের নিয়ে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য রেমিডিয়াল বা প্রতিকারমূলক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ওপর জোর দিয়েছেন।
কোন শিক্ষার্থী কেন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বল, সেটি চিহ্নিত করে তার জন্য আলাদা সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন হলে শিক্ষকদের এই কার্যক্রমে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
তার মতে, প্রচলিত কোচিং ব্যবস্থার পরিবর্তে স্কুল পর্যায়েই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সাপোর্ট লার্নিং চালু করা হলে গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা কমানো সম্ভব।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ড. জিন্নাহ। তার মতে, কারিগরি শিক্ষায় দীর্ঘদিনের সমস্যা এক বা দুই বছরের মধ্যে দূর করা সম্ভব নয়।
এই খাতে দক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের ঘাটতি, আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধার অভাব এবং শিক্ষার পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ ও নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এসব বিষয় সমাধানে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পুনর্গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এদিকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট হলে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করতে পারবে।
ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ শুরু হবে ১১ আগস্ট ২০২৬ থেকে। শিক্ষার্থীরা ১৭ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত এ আবেদন করার সুযোগ পাবে।
সান নিউজ/ জামান
