*ইদ্রাকপুর কেল্লাকে ঘিরে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত নগরায়ণে বদলে যেতে পারে মুন্সীগঞ্জের চিত্র
এই শহরটি আমাদের। এই শহরের আলপথ, অলিগলি, নদীর পাড় আর পুরোনো স্থাপনাগুলোর সঙ্গে মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি। এই শহরের আলো-ছায়ায় আমাদের শৈশব কেটেছে, কৈশোর পেরিয়েছে, আর এখন বেড়ে উঠছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। তাই মুন্সীগঞ্জ শুধু একটি জেলা শহর নয়—এটি আমাদের শেকড়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ ও অস্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সময় বদলেছে, বদলেছে শহরের চেহারা। বেড়েছে মানুষের সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে নগরায়ণ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে মুন্সীগঞ্জ শহর ক্রমেই তার পুরোনো সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হতে থাকে। যে মহল্লাগুলো একসময় ছিল স্বল্পবসতিপূর্ণ, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও ঘনবসতি। মানিকপুর, মাঠপাড়া, খালইস্ট, ইদ্রাকপুরসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে নগরায়ণের ছাপ এখন স্পষ্ট। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও নান্দনিকতাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে?
মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ইদ্রাকপুর কেল্লা। শহরের প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে ইতিহাসের এই স্মৃতিচিহ্নের অবস্থান মুন্সীগঞ্জকে অন্য অনেক জেলা শহরের চেয়ে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী এই কেল্লা শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; এটি মুন্সীগঞ্জের ঐতিহাসিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক।
একদিকে ইদ্রাকপুর কেল্লা, অন্যদিকে ধলেশ্বরী নদী—এই দুই ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জের নগর পরিকল্পনা করা গেলে শহরটি হয়ে উঠতে পারে একটি অনন্য নান্দনিক ও পর্যটনবান্ধব নগরী। ইদ্রাকপুর কেল্লা—শহরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী মুন্সীগঞ্জের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও ইদ্রাকপুর কেল্লা দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে। সময়ের পরিবর্তনে চারপাশের পরিবেশ বদলে গেলেও কেল্লাটি বহন করছে ইতিহাসের দীর্ঘ স্মৃতি।
একসময় যে ভূখণ্ড ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, আজ সেখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক নগরজীবন। কিন্তু আধুনিকতার চাপে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির চারপাশের পরিবেশ যেন হারিয়ে না যায়—এ বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইদ্রাকপুর কেল্লাকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত ঐতিহাসিক অঞ্চল বা হেরিটেজ জোন গড়ে তোলা গেলে মুন্সীগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়তে পারে। কেল্লার আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা, দৃষ্টিনন্দন সবুজায়ন, হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, বসার ব্যবস্থা, তথ্যফলক এবং ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনা তৈরি করা গেলে এটি স্থানীয় মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি বাইরের দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।
শুধু কেল্লাটি সংরক্ষণ করলেই হবে না; এর চারপাশের নগর পরিবেশও হতে হবে পরিকল্পিত ও নান্দনিক। কারণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা তার চারপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়।
স্মৃতির শহর থেকে বহুতল ভবনের শহর
মুন্সীগঞ্জের প্রবীণদের কাছে শহরের অতীত যেন এক অন্যরকম গল্প। একসময় শহরের মহল্লাগুলোতে মানুষ একে অপরকে চিনতেন। এক বাড়ির মানুষ অন্য বাড়ির মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলেন।
কোনো একটি বাড়িতে টেলিভিশন থাকলে সন্ধ্যার পর আশপাশের মানুষজন সেখানে জড়ো হতেন। একটি উঠোনে সবাই মিলে বিটিভির অনুষ্ঠান দেখতেন। সামাজিক সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। বিপদে-আপদে মানুষ ছুটে যেত একে অপরের পাশে।
তখন শহর হয়তো ছোট ছিল, কিন্তু মানুষের হৃদয় ছিল বড়।
আজ শহর বড় হয়েছে। মানুষের বসতি বেড়েছে। বহুতল ভবনে ছেয়ে গেছে একসময়কার অনেক খোলা জায়গা। জীবন হয়েছে দ্রুতগতির। মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর বেড়েছে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। এই পরিবর্তন নগর সভ্যতার স্বাভাবিক অংশ হলেও এর সঙ্গে শহরের পরিবেশ ও নান্দনিকতা যেন হারিয়ে না যায়—সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
নগরায়ণ হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা
ধলেশ্বরী নদী লাগোয়া মুন্সীগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ইদ্রাকপুর কেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদী, পুরোনো মহল্লা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে সমন্বিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে শহরটি হতে পারত দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় জেলা শহর।
কোথায় আবাসিক এলাকা থাকবে, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় পার্ক, কোথায় খেলার মাঠ, কোথায় উন্মুক্ত স্থান, কোথায় পার্কিং, কোথায় ফুটপাত—এসব বিষয় পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে শহরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোকে চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করতে হবে। উন্নয়নের নামে যেন ইতিহাস হারিয়ে না যায়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
জঞ্জাল ও দখলমুক্ত শহরের প্রত্যাশা
সময়ের সঙ্গে শহরের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে নানা নাগরিক সমস্যা। কোথাও সড়কের পাশে আবর্জনা, কোথাও ফুটপাতের ওপর দখল, কোথাও অপরিকল্পিত স্থাপনা—এসব কারণে শহরের সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি পরিচ্ছন্ন শহর গড়তে প্রতিদিন বড় বড় অভিযান পরিচালনার চেয়ে নাগরিকদের সচেতনতা বেশি কার্যকর হতে পারে।
একজন নাগরিককে শহরের সব আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে না। শুধু নিজের ময়লাটি নির্ধারিত স্থানে ফেললেই তিনি শহর পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে অংশ নিতে পারেন। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে প্রশাসনকে বারবার অভিযান পরিচালনা করতে হবে—এমন পরিস্থিতি তৈরি না করে নাগরিক হিসেবে সরকারি জায়গা, ফুটপাত, সড়ক কিংবা নদীর পাড় দখল না করাই দায়িত্বশীল আচরণ। আইন প্রয়োগের আগে নিজেরাই যদি আইন মানি, তাহলে শহরের অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়।
ইদ্রাকপুর কেল্লা ও ধলেশ্বরীকে ঘিরে হতে পারে নতুন পরিকল্পনা মুন্সীগঞ্জের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় ইদ্রাকপুর কেল্লা ও ধলেশ্বরী নদীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কেল্লাকে কেন্দ্র করে একটি নান্দনিক হেরিটেজ করিডর, নদীর পাড়ে সবুজায়ন ও হাঁটার পথ, ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ সাইনেজ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলা হলে পুরো শহরের সৌন্দর্য নতুন মাত্রা পেতে পারে।
এর সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যুক্ত করা গেলে মুন্সীগঞ্জ হয়ে উঠতে পারে ইতিহাস ও আধুনিকতার এক অনন্য সমন্বিত নগরী।
দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়-
একটি সুন্দর শহর গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের অবশ্যই রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন, সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দখলমুক্ত পরিবেশ, সবুজায়ন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে তাদের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। তবে নাগরিকরা যদি নিজেরাই দায়িত্বশীল না হন, তাহলে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ব্যবসায়ীকে দোকানের সামনে ময়লা না ফেলতে হবে। বাড়ির মালিককে নির্মাণসামগ্রী সড়কে ফেলে রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। পথচারীকে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে হবে। কেউ যেন ফুটপাত বা সরকারি জায়গা নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে না করেন—সেই মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
এখনো সময় আছে-
মুন্সীগঞ্জ এখনো এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে শহরকে নতুনভাবে সাজানো সম্ভব। নগরায়ণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। দল-মত, শ্রেণি-পেশা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শহরের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমাজ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে নিয়ে একটি সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ শহর শুধু প্রশাসনের নয়, শহর নাগরিকদেরও।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে শহরে বেড়ে উঠেছেন, সেই শহরের ইতিহাস যেন আগামী প্রজন্মের কাছে হারিয়ে না যায়। ইদ্রাকপুর কেল্লার মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যেন কেবল অতীতের স্মারক হয়ে না থাকে; বরং সেগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হোক ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা।
ধলেশ্বরীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহরটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নান্দনিক ও পরিকল্পিত হলে মুন্সীগঞ্জের মানুষ যেমন গর্বিত হবে, তেমনি দেশের অন্যান্য মানুষের কাছেও শহরটি হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণের কেন্দ্র। মুন্সীগঞ্জ আমাদের। ইদ্রাকপুর কেল্লা আমাদের ইতিহাস। ধলেশ্বরী আমাদের প্রকৃতি। আর এই শহরের ভবিষ্যৎ আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
আজ থেকেই যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিই—
যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলব না, অবৈধ দখল করব না, আইন মানব, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করব এবং শহরের সম্পদকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে দেখব—তাহলে আগামী দিনের মুন্সীগঞ্জ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, নান্দনিক, নিরাপদ ও বাসযোগ্য। একটি সুন্দর শহর গড়ে ওঠে শুধু ইট-পাথরে নয়; গড়ে ওঠে মানুষের দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও সম্মিলিত স্বপ্নে।
সান নিউজ/আরএ
