একচিলতে রোদ্দুর দেখে যেমন ঋতু বদলের হিসাব মেলানো যায় না, তেমনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে প্রথম দুই ম্যাচের ধাক্কা দেখে সদ্য অভিষেক হওয়া লাল-সবুজের নতুন মুখগুলোর সামর্থ্যও পুরোপুরি মেপে ফেলা যায় না। জাকার্তার গোলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে কোচ থমাস ডুলির আস্থায় যখন ফারহান আলী ওয়াহিদ, শুকি ইতোফুসা, জিদান আলেকজান্ডার ইউসুফ ও মিনহাজুল করিম স্বাধীনরা লাল-সবুজ জার্সিতে প্রথম পা রাখেন, তখন কোটি সমর্থকের বুকভরা আশা ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের নির্মম ও গতিময় বাস্তবতা এই নবাগতদের সামনে বড় এক পরীক্ষার দেওয়াল তুলে দিয়েছে।
মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ এবং সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ গোলের হতাশাজনক হার সেই কঠিন বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়। তবে এই ব্যর্থতার ভিড়েও কি প্রবাসীরা কোনো আশার প্রদীপ জ্বালাতে পেরেছেন, নাকি ডুলির ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষামূলক তাসের ঘর হিসেবেই তারা হারিয়ে যাবেন—সেই প্রশ্ন এখন চারদিকে। বিশেষ করে আগামীকাল ১ অক্টোবরের ইন্দোনেশিয়া ম্যাচটিই নির্ধারণ করে দেবে কোচ ডুলির এই মহাপ্রেমের বাজি আদতে কতটা সফল হলো।
এদিকে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও দলের ভেতরের নানা গুঞ্জন এখন বেশ চাউর হয়েছে। জাকার্তার টিম হোটেলের লবি থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা পর্যন্ত সবার মুখে মুখে কেবল ফারহান আলী ওয়াহিদের নাম। প্রথম ম্যাচে মাত্র প্রথমার্ধ খেলার সুযোগ পেলেও পরের ম্যাচে সাইডবেঞ্চে পুরোটা সময় বসে কাটাতে হয়েছে তাকে। বাতাসে জোর ফিসফাস—কোচ ডুলির সঙ্গে নাকি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন এই ব্রিটিশ প্রবাসী তরুণ, এমনকি ম্যাচ শেষে নাকি ফারহানের বাবার সঙ্গেও কোচের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে! যদিও টিম ম্যানেজমেন্ট বা দলের ম্যানেজার এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অভিযোগের কথা সরাসরি অস্বীকার করেছেন। বরং গুঞ্জনের জাল ছিঁড়ে জানা গেছে, গতকাল জাকার্তার মাঠে কোচ নিজেই ফারহান ও শুকিকে নিয়ে আলাদাভাবে সেট পিস অনুশীলন করিয়েছেন। যার অর্থ দাঁড়ায়, ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ডুজে এই দুই তরুণকে মাঠে নামানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কোচের ট্যাকটিক্যাল খাতায়।
অভিষিক্তদের মধ্যে ডিফেন্স সামলানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পরিপক্বতা দেখিয়েছেন ইংল্যান্ড প্রবাসী জিদান ইউসুফ। প্রথম ম্যাচেই ৩১ মিনিটে দারুণ কিছু ট্যাকল ও ইন্টারসেপশন করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। সিঙ্গাপুর ম্যাচে দল পিছিয়ে পড়ার পর রক্ষণের দুর্গ আগলে রেখেছিলেন এই অতন্দ্র প্রহরী। প্রায় ৩৮ বার বল স্পর্শ করে প্রতিপক্ষের একাধিক বিপজ্জনক কাউন্টার-অ্যাটাক নিজের চমৎকার পজিশনিং ও ফিজিক্যাল শক্তির জোরে রুখে দেন জিদান। তার এই রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা দলের মনোবল বেশ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, বদলি হিসেবে নেমে আলো ছড়িয়েছেন দেশীয় ফুটবলার মিনহাজুল করিম স্বাধীনও। মাঠে কাটানো অল্প সময়ে ১৫ বার বল স্পর্শ করার পাশাপাশি উইং দিয়ে দারুণ দুটি ক্রস বাড়িয়ে তিনি কোচ ডুলের আক্রমণভাগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে আক্রমণভাগে কাঙ্ক্ষিত ফিনিশার খোঁজার যে স্বপ্ন ডুলি দেখেছিলেন, তার পুরোটা এখনো মেলাতে পারেননি ফারহান। প্রথম ম্যাচে মাঝমাঠ থেকে ঠিকমতো বলের জোগান না পাওয়ায় বক্সে একরকম একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি; প্রথমার্ধে মাত্র ১১ বার বল ছুঁয়ে কোনো শটই লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। অন্যদিকে, লেফট-উইংয়ে খেলা শুকি ইতোফুসা তুলনামূলক বেশি সচল ছিলেন। ১৮ বার বলের ছোঁয়া পাওয়া শুকির পাসিং অ্যাকুরেসি বেশ সন্তোষজনক হলেও মালয়েশিয়ার জমাট রক্ষণ ভেঙে ওয়ান-অন-ওয়ান ড্রিবলিংয়ে তিনি কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন। তবে সিঙ্গাপুর ম্যাচে তার খেলায় কিছুটা হলেও ইতিবাচক ছোঁয়া দেখা গেছে। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে আগামীকালের ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে এই নতুন প্রবাসীদের ভাগ্য ও ডুলির আস্থার সঠিক মূল্যায়নের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
সান নিউজ/রাজীব
