গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর সুগার মিলস এক সময় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিলভ যা প্রায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সুগার মিলটি বন্ধ থাকায় এ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিনিশিল্প সংশ্লিষ্ট শত শত শ্রমিক, আখচাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড ১৯৫৭-৫৮ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদন শুরু করে। পরে বিএমআরই প্রকল্পের আওতায় মিলটির দৈনিক আখ মাড়াই সক্ষমতা ১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন থেকে ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের লোকসান, পুরোনো যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি চিনিকলের সঙ্গে রংপুর সুগার মিলসের আখ মাড়াই কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করে।
মিলটি বন্ধ হওয়ার পর এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবিকা সংকটে পড়ে। শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আখচাষি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেল মালিক ও দিনমজুরদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন, কেউ পেশা বদল করেছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে বেকার রয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও।
কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি এখন রংপুর সুগার মিলের আয়ের খাত বলতে আর কিছুই নেই। তবে আয় না থাকলেও খরচের পাল্লা ভারী হচ্ছে ঠিকই। মিলটি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রতি মাসে এখানে খরচ প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। গত ৬৭ মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ রক্ষণাবেক্ষণ খাতে সরকারের মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, এক সময় কর্মচাঞ্চল্যে মুখর কারখানাটি এখন নীরব। আখবাহী ট্রাকের সারি নেই, বন্ধ চিমনি, থেমে আছে উৎপাদন। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় খোলা আকাশের নিচে থাকা যন্ত্রপাতি, পরিবহন যান ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কারখানার বিস্তীর্ণ এলাকায় আগাছা ও ঝোপঝাড় জন্মেছে।
জানা যায়, বার্ষিক ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে ১৯৫৭-৫৮ মাড়াই মৌসুমে রংপুর সুগার মিলস আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। ২০০৪ সালের মার্চ মাসে কারখানাটি প্রথম লে-অফ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০০৬ সালের আগস্টে পুনরায় আখ মাড়াই শুরু হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে আবারও কারখানাটির আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
প্রাকৃতিক ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকা এই মিলটিকে এখনই সচল করার উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাঘাটার আখচাষি আলতাফ হোসেন বলেন, মিলের কারণেই এ এলাকায় বৃহৎ পরিসরে আখচাষ হতো। এটি পুনরায় চালু হলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি এলাকার অর্থনীতিও চাঙা হবে।
আরেক আখচাষি নুর ইসলাম বলেন, চিনিকল চালু হলে আখ বিক্রি নিয়ে আর চিন্তা থাকবে না। তখন অনেক কৃষক আবার আখচাষ শুরু করবেন।
রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান সুজা বলেন, রংপুর চিনিকল শুধু একটি কারখানা নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল। মিলটি চালু হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এদিকে, সুগার মিলস উৎপাদন বন্ধ থাকার পরও একটি প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের বিনিময়ে রাষ্ট্র আদতে কী পাচ্ছে, এমন প্রশ্ন তুলেছে সুশীল সমাজ ও স্থানীয় নাগরিকরা।
রংপুর সুগার মিলের শ্রমিক নেতা আবু সুফিয়ান সুজা বলেন, প্রতি মাসে ২০ লক্ষ টাকা ধরে গত সাড়ে ৫ বছরে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানে অবহেলা-অনাদরে পড়ে থাকা শত শত কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে কেউ কথা বলছে না, কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষের কষ্টও বাড়ছে।
গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক দীপঙ্কর সাহা বাপ্পা বলেন, মিলটি বন্ধ রাখার পরও এখানে রাষ্ট্র যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছে, তা মিলের বেকার শ্রমিক-কর্মচারীদের যেমন কোনো উপকারে আসছে না, তেমনি রাষ্ট্রেরও কোনো উপকারে আসছে না। এই চিনিকলটি দ্রুত চালু করা অথবা এটিকে নতুন কোনো কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প-কারখানায় রূপান্তর করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার তিন ধাপে বন্ধ হওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও বাস্তবে এখনো তার সুফল মেলেনি। তাদের দাবি, দ্রুত কারিগরি সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে রংপুর সুগার মিলস পুনরায় চালু করতে হবে। এটি সচল হলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে আবারও গতি ফিরবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা বলেন, মিলটি পুনরায় চালু করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। কারণ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, যানবাহন ও কাঁচামালের প্রাথমিক সুবিধা সবই রংপুর সুগার মিলে বিদ্যমান রয়েছে। প্রয়োজন কেবল সঠিক পরিকল্পনা ও সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ।
আখ খামারসহ রংপুর সুগার মিলের নিজস্ব মোট জমির পরিমাণ ১ হাজার ৯৩২ একর। আধুনিকায়নের মাধ্যমে মিলটিতে বহুমাত্রিক উৎপাদনের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছে সচেতন মহল।
রংপুর সুগার মিলের ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় মেরামত, আধুনিকায়ন ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে মিলটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারে। এতে চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মিলটি চালু করা সম্ভব হলে প্রায় ১ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং এলাকার অন্তত ২০ হাজার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে।
শাহিনুল ইসলাম বলেন, রংপুর সুগার মিলস সচল হলে এর সঙ্গে শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের উপজাত দ্রব্য বা মোলাসেস (ঝোলা গুড়) একত্র করে একটি বড় আধুনিক ডিস্টিলারি কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। তখন কেবল চিনিই নয়, উপজাত দ্রব্য হিসেবে উন্নতমানের জৈবসার ও পশুখাদ্য উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার অপার সুযোগ তৈরি হবে।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসদুর রহমান মোল্লা বলেন, গাইবান্ধার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য শিল্প-কারখানা প্রয়োজন। শুনেছি চিনিকলটি চালুর ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ আছে। চিনিকলটি চালু হলে নিশ্চয়ই তা ইতিবাচক দিক বয়ে নিয়ে আসবে।
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন বলেন, এখানকার মানুষের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে মিলটি চালু করা দরকার। এ ব্যাপারে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
জানা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিলস, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর সুগার মিলস, পঞ্চগড় সুগার মিলস, পাবনা সুগার মিলস, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস ও কুষ্টিয়া সুগার মিলে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এরপর থেকে মিলগুলোতে সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী শুধু রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
রংপুরের বদরগঞ্জে শ্যামপুর চিনিকলের ১১২ একর জমি রয়েছে। সেখানে এখনো ৬৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। গত ৬৭ মাসে তাদের বেতন-ভাতা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ১৫ কোটি টাকার বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিলের জমির একটি অংশ লিজ দেওয়া হয়েছে এবং কিছু জায়গা অবৈধ দখলেও রয়েছে। দীর্ঘদিন অচল থাকায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের একটি অংশ নষ্ট বা চুরি হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর সুগার মিলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মাসে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় হচ্ছে। গত ৬৭ মাসে মিলটির রক্ষণাবেক্ষণ ও বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বেশি।
এছাড়া পঞ্চগড় সুগার মিলে ৬৭ মাসে ১২ কোটির বেশি এবং সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব মিলের জমিও নামমাত্র মূল্যে লিজ ও দখলের অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্রে জানা যায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার একর। উৎপাদন বন্ধ থাকা মিলগুলোর প্রতিটিতে গত ৬৭ মাসে গড়ে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হয়েছে। সেই হিসাবে বন্ধ থাকা ছয়টি মিলেই ব্যয়ের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সান নিউজ/ জামান
