হাইলাইটস
◼ তুরাগে মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে অল্প দূরেই মিলল রহস্যময় মোটরসাইকেল
◼ জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দাবি, ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তাহসিফ
◼ ধাওয়াকারীরা ‘পুলিশের লোক’ ছিলেন বলে দাবি করেছেন দীপ
◼ মাদক কারবারিদের তাড়া খেয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, খতিয়ে দেখছে পিবিআই
◼ নিখোঁজের রাতে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যায় সিসিটিভি ফুটেজে
◼ উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, চলছে যাচাই-বাছাই
◼ তাহসিফের মৃত্যুকে আত্মহত্যা মানতে নারাজ পরিবার, দাবি সুষ্ঠু তদন্তের
ঢাকার তুরাগ নদে ভেসে ওঠা সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনা। যে স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখান থেকে অল্প দূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে একটি মোটরসাইকেল। তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, সেটি তাহসিফেরই হতে পারে।
ঘটনাটির অনুসন্ধানে যুক্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের এলাকা ঘিরে অনুসন্ধান চালানোর একপর্যায়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। যানটির মালিকানা ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেটিকে জব্দ করে থানায় রাখা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যে রাজবাড়ী ঘাট এলাকায় তাহসিফের মরদেহ পাওয়া যায়, সেটি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের আনাগোনার জন্য পরিচিত। সেই সূত্র ধরে তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, কোনো অপরাধী চক্রের তাড়া খেয়ে বা আতঙ্কিত হয়ে তিনি নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন কি না।
এ ঘটনার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের নাম। তাহসিফের পরিবার তাকে নিহত তরুণের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তিনি এবং তাহসিফ ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাহসিফ নদীর দিকে ছুটে গিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন। আর তিনি নিজে সেখান থেকে দ্রুত সরে যান।
তবে ধাওয়াকারীরা কারা ছিল, সে বিষয়ে তার বক্তব্য আরও রহস্য তৈরি করেছে। দীপের দাবি, তাদের পিছু নেওয়া ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন। যদিও এ বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তকারীরা তার দেওয়া তথ্য অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই-বাছাই করছেন।
পিবিআই সূত্র জানায়, দীপকে সঙ্গে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। তার বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়ার রাতে উত্তরার একটি আবাসিক প্রকল্পের গ্যারেজসংলগ্ন এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে আরেক ব্যক্তির সাক্ষাৎ হয়। দুজন করমর্দনের পর পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে এলাকা ত্যাগ করেন। পরে ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করে পরিবার।
ফুটেজে আরও একটি দিক নজরে এসেছে তদন্তকারীদের। তাহসিফ যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করছিলেন, তাতে কোনো নম্বরপ্লেট দেখা যায়নি। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটিতেও নম্বরপ্লেট নেই। ফলে দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তাহসিফ। রাতে পরিবারের কাছে পাঠানো একটি ভয়েস বার্তায় তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি বাসায় ফিরছেন। কিন্তু এরপর তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
পরদিন বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই সময় মোটরসাইকেলের কোনো হদিস না পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে সন্দেহ আরও গভীর হয়। পরে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকা থেকে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ তাঁর পরিবার। নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম প্রকাশ্যে সন্দেহ জানিয়েছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যার ঘটনা নয়। তার ভাষ্য, সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
ময়নাতদন্ত শেষে ইতোমধ্যে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে এবং জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে। কিন্তু তুরাগের পানি থেকে উদ্ধার হওয়া সেই নিথর দেহের পেছনের রহস্য এখনো অমীমাংসিত। ধাওয়া, নদীতে ঝাঁপ, নিখোঁজ মোটরসাইকেল, সিসিটিভির শেষ দৃশ্য এবং ঘনিষ্ঠজনের বয়ান মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই, তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে সত্যিই কী ঘটেছিল?
সান নিউজ / রাজীব
