পবিত্র কুরআনে মহররমকে চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।হাদিসে এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে, যা এর বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতের প্রমাণ বহন করে।
মহররমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা, কারবালার ত্যাগ, ধৈর্য, সত্যের প্রতি অবিচলতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই এ মাস কেবল ইতিহাস স্মরণ করার সময় নয়; বরং নিজের জীবনকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নতুনভাবে গড়ে তোলারও এক অনন্য সুযোগ। মহররম আমাদের এমন কিছু শিক্ষা দেয়, যা একজন মুমিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সেসব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি হলো:-
১. ধৈর্য, ত্যাগ ও সহনশীলতার অনুশীলন
মহররম আমাদের জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলো ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে শেখায়। মানুষের জীবন নানা পরীক্ষা ও সংকটে পরিপূর্ণ। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই একজন মানুষের ঈমান, চরিত্র ও মানসিক দৃঢ়তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং আশুরার স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু বিসর্জন দেওয়ার উজ্জ্বল শিক্ষা বহন করে।
২. জুলুমের বিরুদ্ধে ন্যায়ভিত্তিক সচেতনতা
মহররম আমাদের অন্যায়, জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। ইসলাম কখনো জুলুমকে সমর্থন করে না; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং অবিচারের বিরোধিতা করার নির্দেশ দেয়। কারবালার ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রতিবাদ হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং শরিয়তের নির্দেশনার আলোকে, যাতে তা বিশৃঙ্খলা, ফিতনা বা আরও বড় ক্ষতির কারণ না হয়।
৩. সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন থাকার শিক্ষা
মহররমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে ত্যাগ, আদর্শ ও নৈতিক দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হজরত হোসাইন (রা.) এমন এক সময়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি ক্ষমতা, নিরাপত্তা কিংবা পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে নিজের আদর্শ বিসর্জন দেননি। এ ঘটনা আমাদের শেখায়, একজন মুমিনের মর্যাদা সত্যকে ধারণ করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং আদর্শের প্রশ্নে কখনো আপস না করার মধ্যেই নিহিত।
৪. নতুন বছরের শুরুতে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি
মহররম একজন মুমিনকে নিজের জীবন নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দেয়। একটি বছর শেষ হয়ে আরেকটি বছরের সূচনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন থেকে আরও একটি বছর কমে গেল এবং আমরা আখিরাতের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। তাই এ সময় বিগত বছরের আমল, সফলতা ও ব্যর্থতার হিসাব নেওয়া, ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং আগামী দিনগুলোকে আরও সুন্দর ও কল্যাণময় করে গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।
৫.আল্লাহর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য
মহররম আমাদের শেখায়, আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
যখন একজন মুমিন উপলব্ধি করেন যে আল্লাহ নিজেই এ মাসকে বিশেষ সম্মান দান করেছেন, তখন তাঁর অন্তরে এ মাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও ইবাদতের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পায়। তাই মহররম আমাদের বেশি বেশি নফল রোজা, তওবা, ইস্তিগফার, জিকির এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের আহ্বান জানায়।
সান নিউজ/ আরাফাত
