দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের ভূমিহীন কৃষক আলী আকবর গংয়ের এককালীন সরকারি বন্দোবস্তকৃত খাস জমি নিজেদের দাবি করে দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে ভূমিহীন আলী আকবর গং আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগী আলী আকবর গং জানান, পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ হরিরামপুর মৌজার তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি বাংলাদেশ সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি। তাঁর পিতা আলী আকবর একজন ভূমিহীন ও গরিব কৃষক হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের নিকট ১নং খতিয়ানভুক্ত ৫০৩ দাগের সম্পত্তি বন্দোবস্ত পাওয়ার জন্য দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আবেদন করেন।
পরবর্তীতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়, দিনাজপুরের মাধ্যমে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়। যার কেস নং ঢষষষ.২০৯/৮৬-৮৭ এবং ৩১/০২/৮৬ মূলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নং-বার-২০৯/৮৬-৮৭। একরপ্রতি ৫০০ টাকা হারে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের শর্তে গত ৩১/০১/১৯৮৭ সালে ৩০১/০১(৩)আর এম স্মারকে তাঁর পিতা আলী আকবরকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে ১৯৮৭ সাল থেকে তাঁর পিতা আলী আকবর ওই জমিতে চাষাবাদ ও ভোগদখল করে আসছিলেন। তিনি ভোগদখলে থাকা অবস্থায় দক্ষিণ হরিরামপুর মৌজার ৫০৩ নং দাগের নালিশি সম্পত্তি নিজ নামে খারিজ করেন।
এ বিষয়ে খারিজ খতিয়ান নং-১৩৫৬ এবং ডি.সি.আর. প্রাপ্ত হয়ে বাংলা ১৪৩৩ সাল পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁর পিতার পক্ষে আলী আকবর গং ওই নালিশি সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শাহাদাৎ হোসেন শাদো ও তৌফিকুল ইসলাম তপু গং উপজেলার দক্ষিণ হরিরামপুর মৌজার আলী আকবরের সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়া ১নং খতিয়ানভুক্ত ৫০৩ দাগের ২২.১৫ একর সম্পত্তির মধ্যে ১.২১ একর সম্পত্তি নিজেদের ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে জবরদখলের চেষ্টা করে আসছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
এমতাবস্থায় উপজেলার দক্ষিণ হরিরামপুর ইউনিয়নের হরিরামপুর মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির ৫০৩ দাগের সরকারি খাসজমি জবরদখলের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, দিনাজপুরকে অবগত করা হলে পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের স্মারক নং-২৯(৩), তারিখ ১০/০১/২০১২ ইং-এর মাধ্যমে দক্ষিণ হরিরামপুর মৌজার নালিশি ৫০৩ দাগের সরকারি খাসজমি জবরদখল সংক্রান্ত পত্র পাওয়া যায়।
ওই পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে পার্বতীপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ডেপুটি কালেক্টরকে ৫০৩ দাগের পরিসীমা চিহ্নিত করা, ব্যক্তি খতিয়ানের ৪.৪৬ একর জমি চিহ্নিত করা, খাস খতিয়ানের ১৭.৬৯ একর জমি চিহ্নিত করা, খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির মধ্যে বন্দোবস্তকৃত সম্পত্তি যাচাই করে চিহ্নিত করা এবং অবশিষ্ট খাস সম্পত্তি চিহ্নিত করে অবৈধ দখলকারদের উচ্ছেদের কার্যক্রম গ্রহণ ও চলমান জরিপে সরকারের নামে রেকর্ডকরণের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত ও পরিমাপের পর গত ১৮/০২/২০১৩ ইং তারিখে এসএ/বন্দোবস্ত চার-৫৬/১৩/৮৭(২) নং স্মারকে সরকারি খাসজমি জবরদখল বিষয়ে নির্দেশনা ও বাস্তবায়নপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোঃ শাহাদাৎ হোসেন শাদো ও মোঃ তৌফিকুল ইসলাম তপু গং উপজেলার দক্ষিণ হরিরামপুর মৌজার ৫০৩ দাগের ২২.১৫ একর সম্পত্তির মধ্যে ১.২১ একর সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে আলী আকবর গংকে উচ্ছেদ করে জবরদখলের চেষ্টা করেন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
উক্ত নালিশি সম্পত্তি আলী আকবর গং তাঁদের বন্দোবস্তকৃত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেন। সূত্রোক্ত স্মারকের নির্দেশনা মোতাবেক দক্ষিণ হরিরামপুর মৌজার ৫০৩ দাগের ২২.১৫ একর সম্পত্তি সরেজমিনে তদন্ত এবং ওই দাগের ভোগদখলকারীদের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়।
তদন্তে দেখা যায়, ৫০৩ নং দাগের ২২.১৫ একর সম্পত্তির মধ্যে ১৭.৬৯ একর সম্পত্তি ১নং খতিয়ানভুক্ত এবং ৪.৪৬ একর সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন। নির্দেশনা মোতাবেক ভোগদখলকারীদের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১নং খতিয়ানভুক্ত ১৭.৬৯ একর জমির মধ্যে ৮.২১ একর সম্পত্তির বন্দোবস্তগ্রহীতাদের কাগজপত্র সঠিক পাওয়া যায়।
অবশিষ্ট ৬.৮৮ একর সম্পত্তির ভোগদখলকারীরা বন্দোবস্ত সূত্রে জমি প্রাপ্ত হয়েছেন মর্মে দাবি করলেও তাঁদের দাবির স্বপক্ষে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এছাড়া ২.৬০ একর সম্পত্তি ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরের বিভিন্ন বন্দোবস্ত কেসমূলে বন্দোবস্ত গ্রহণ করলেও তাঁদের অনুকূলে কবুলিয়ত দলিল সম্পাদিত হয়নি। তাঁরা কবুলিয়ত সম্পাদনের জন্য জেলা প্রশাসক, দিনাজপুর বরাবর আবেদন করলেও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর নির্দেশনা অনুযায়ী ৫০৩ দাগের ১৭.৬৯ একর সম্পত্তির পরিসীমা চিহ্নিত করা হয় এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ৪.৪৬ একর সম্পত্তির অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়।
ভুক্তভোগী আলী আকবর গংয়ের অভিযোগ, বন্দোবস্তপ্রাপ্ত হয়ে তাঁরা ১নং খতিয়ানভুক্ত ৫০৩ দাগের সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছিলেন। কিন্তু গত ২৩/০৭/২০২৬ ইং তারিখ বেলা ১২টার দিকে মোঃ শাহাদাৎ হোসেন শাদো ও মোঃ তৌফিকুল ইসলাম তপু গং লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে তাঁদের বন্দোবস্ত সূত্রে পাওয়া ভোগদখলীয় সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে আমন ধানের চারা রোপণ করেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
এ ঘটনায় গত ২৩/০৭/২০২৬ ইং তারিখে দিনাজপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত, পার্বতীপুরে মোঃ শাহাদাৎ হোসেন শাদো ও মোঃ তৌফিকুল ইসলাম তপুকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আলী আকবর গং সাংবাদিকদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা ভূমিহীন, অসহায় ও গরিব মানুষ। জীবন-জীবিকার তাগিদে সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়া সম্পত্তিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। কিন্তু সেই জমি ভূমিদস্যুরা জবরদখল করে নিয়েছে।”
তাঁরা আরও বলেন, “সাংবাদিকদের মাধ্যমে আমরা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে আমাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র সম্পদ ফিরে পাওয়ার দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে যারা জোরপূর্বক আমাদের জমি দখল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।”
সান নিউজ/ জামান
