নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশকে নিয়ে একটি প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। বাব এল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এ জোট গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী কৌশলগত সামুদ্রিক করিডোরের অন্তর্ভুক্ত তিনটি জলপথে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের পথ সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকার করেছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, এ পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এ পথ দিয়ে আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হতো।
এ ছাড়া, সাম্প্রতিক উত্তেজনার জেরে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা বাব এল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরীয় নৌপথে বারবার হামলা চালিয়ে আসছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোটটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিত বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। লোহিত সাগরে ইইউর ইতোমধ্যেই ‘অ্যাসপিডেস’ নামে একটি নৌ-নিরাপত্তা মিশন রয়েছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটটি কীভাবে ভিন্ন ভূমিকা পালন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জানা গেছে, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস এ জোটের স্বাক্ষরকারী দেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকেন্দ্রিক সংঘাতের কারণে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এ জোটে যোগ দেয়নি।
সৌদি মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অন্যান্য দেশের জন্যও নিজ নিজ জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর জোটের সনদে যোগদানের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বাস, সামুদ্রিক নিরাপত্তা একটি যৌথ দায়িত্ব। অভিন্ন ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলায় সহযোগিতা ও সমন্বয়ই এ জোটের মূল ভিত্তি।
আল জাজিরা জানিয়েছে, প্রতিটি দেশ কী ধরনের জাহাজ বা বিমান সরবরাহ করবে, তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে কার্যক্রমের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অভিযানগত পরিকল্পনা সমন্বয়, যৌথ মহড়া এবং সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, জোটটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক। এটি কোনো রাষ্ট্রকে লক্ষ্যবস্তু করবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবকে জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জোটটির সদর দপ্তরও সৌদি আরবে হবে, যদিও বিবৃতিতে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান উল্লেখ করা হয়নি।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে একটি সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করেছে। এর ফলে লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও রিয়াদ পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তার বেশিরভাগ তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। পাইপলাইনটি দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র ও শোধনাগারকে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
সৌদি আরবের রপ্তানি পণ্য বাব এল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করে। প্রণালিটি ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথের মুখোমুখি ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটি কৌশলগত সুবিধা পেয়ে থাকে।
বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। এ পথ দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। এটি লোহিত সাগরে প্রবেশ ও প্রস্থানের দুটি প্রধান পথের একটি; অন্যটি হলো সুয়েজ খাল।
সূত্র: গালফ নিউজ
সান নিউজ/ হুমায়রা
