দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থবির থাকা সরকারি বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ আবারও গতি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে সরকারি চাকরিজীবীদের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য যে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল নীতিনির্ধারণী মহলে।
সেই প্রেক্ষাপটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার খবর সরকারি কর্মচারীদের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। তিনটি বেতন কমিশনের সুপারিশ প্রণয়নে পুনর্গঠিত কমিটি ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে প্রথম ধাপ কার্যকর হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী পাচ্ছেন মাত্র ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল বেতন।
গত ২১ এপ্রিল সরকার জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন-সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি পুনর্গঠন করে। সম্প্রতি ওই কমিটি তাদের মতামত জমা দিয়েছে। কমিটির মতামতের ভিত্তিতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য গঠিত কমিটি আর্থিক চাপ সামলাতে কয়েকটি ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। আগামী জুলাই থেকে প্রথম ধাপ হিসেবে মূল বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সচিব কমিটির সুপারিশের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এ জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধি করা হবে। তবে এ জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
২০১৫ সালে সর্বশেষ অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণার পর দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নবম পে-স্কেলের সুপারিশ প্রণয়নে পে-কমিশন গঠন করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই পে-কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
প্রস্তাবিত বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত রাখা হয়েছে ১:৮; যা দেশের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বনিম্ন। তুলনামূলকভাবে দেখলে, ১৯৭৩ সালে প্রথম বেতন কমিশনে এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪ এবং ২০১৫ সালের সর্বশেষ বেতন কমিশনে ছিল ১:৯.৪।
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারী মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা এবং বাড়িভাড়া ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মোট পান ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। প্রস্তাবিত বেতনস্কেলে ওই কর্মচারীর মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা এবং ভাতাসহ মোট বেতন দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।
একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, তবে যুক্তিসঙ্গত সমতা বিধানের স্বার্থে উচ্চতর গ্রেডে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম হবে। যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা ও ঝুঁকি ভাতার মতো সুবিধাগুলো সাধারণত ১০ম বা ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন। পঞ্চম গ্রেড থেকে উপরের গ্রেডে প্রযোজ্য গাড়ি সেবা নগদায়ন ভাতা এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে, ফলে শতকরা হারে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ভাতা বৃদ্ধির হার কম দেখাবে।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে বর্তমানে প্রদত্ত ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা প্রচলিত নিয়মে সমন্বয় করা যেতে পারে।
সাননিউজ/আরএ
