রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, মৌসুমি সবজির সরবরাহ কমে আসা এবং বাজারে সরবরাহ সংকট— এসব কারণ দেখিয়ে বিক্রেতারা প্রায় সব ধরনের সবজিই বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। বর্তমানে অধিকাংশ সবজির কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে, আর কাঁকরোল, শসা ও বেগুনের মতো কিছু সবজির দাম পৌঁছেছে ১২০ টাকায়।
একই সঙ্গে বেড়েছে ডিম, চিনি, ডাল, আটা-ময়দা, চাল, মাছ, মাংস ও ভোজ্যতেলের দামও। বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে, কারণ খুচরা ব্যবসায়ীরা কম লাভে তেল বিক্রিতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
এদিকে ডিমের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে ডজনপ্রতি ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে, গরুর মাংস ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস এক হাজার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে; অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্য কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম।
শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। আজকের বাজারে সবচেয়ে বেশি দামের সবজির তালিকায় রয়েছে কাঁকরোল, শসা ও বেগুন, যেগুলোর কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
আজকের বাজারে প্রতি কেজি পটল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, কাঁকরোল প্রতি কেজি ১২০ টাকা, বেগুন (গোল) প্রতি কেজি ১২০ টাকা, বেগুন (লম্বা) প্রতি কেজি ১০০ টাকা, দেশি শসা প্রতি কেজি ১২০ টাকা, হাইব্রিড শসা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, ঝিঙা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ধুন্দল প্রতি কেজি ১০০ টাকা, ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, জালি প্রতি পিস ৬০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোজ্যতেলের দাম বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে মুনাফা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকটের নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানে এখনো তেল মিলছে না। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর চিনি ও মসুর ডালের মতো বেশ কিছু অতি প্রয়োজনীয় মুদি পণ্যের দাম বেড়েছে।
একই সঙ্গে বাজারের প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলা, পোলাওয়ের চালসহ আরও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে গত দু-তিন সপ্তাহে।
সকালে রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা, সেগুনবাগিচা, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫-২০ টাকা বেড়ে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। আগে এই ডিম ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় মিলতো। আর গত রোজার মধ্যে ছিল ১১০ টাকা ডজন।
সপ্তাহ ব্যবধানে কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। খোলা আটা ও ময়দার দামও কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা আটা ৫৫ টাকা এবং খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া কেজিতে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এলাচের দাম। বর্তমানে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৮০০ থেকে পাঁচ হাজার ৪০০ টাকায়, যা আগে ছিল চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা।
প্রোটিনের উৎস ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮৫-১৯০ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগি ৩৪০-৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে চালের দামের চিত্রও উদ্বেগজনক। সারাদেশে বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হলেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব নেই। বরং খুচরা পর্যায়ে মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণ বলছে, এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম চার শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে নয় শতাংশের বেশি।
ভোজ্যতেলের বাজারেও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে লিটার ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহকারীরা তাদের লাভের অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। লিটারপ্রতি মাত্র দুই টাকা লাভে তেল বিক্রি করতে অনীহা দেখাচ্ছেন ছোট দোকানিরা। ফলে অনেক পাড়া-মহল্লার দোকানে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে গেছে।
অন্যদিকে, গত রমজানের পর থেকেই গরুর মাংসের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস মানভেদে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির মাংসের জন্য ক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে প্রতি কেজি এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা।
মাছের বাজার এখন আরও চড়া। চাষের মাছ থেকে শুরু করে নদ-নদীর মাছ—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলা মাছের দাম ঠেকেছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো সাধারণ মাছগুলোও এখন ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, মাস ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সবজি, মাছ ও মাংসের উচ্চ দাম এখনো ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে। মৌসুমি ঘাটতি ও পরিবহন ব্যয় বাড়াকে সবজির দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে মোট মজুরি বাড়ার হার সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ১৬ শতাংশে, যা মার্চে ছিল আট দশমিক ০৯ শতাংশ।
রামপুরা বাজারে বাজার করতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, আজকে বাজারে এসে দেখছি সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। এত বেশি দামে সাধারণ মানুষের সবজি কিনে খাওয়া অনেকটাই কঠিন। আজকে বাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। কিছুদিন আগে পেঁপের দাম কম থাকলেও এখন এটা বাড়তি দামের সবজি। আজ প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা করে। শসা, করলা, বেগুন, কাঁকরোল প্রতি কেজি ১২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এত দাম যদি হয় তাহলে আমরা সবজি কিনব কীভাবে?
মালিবাগ বাজারের সবজি বিক্রেতা চাঁদ মিয়া বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে সবজির দাম বাড়তি যাচ্ছে। এর মূল কারণ সবজি পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির কারণে কৃষকের সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চাহিদার তুলনায় বাজারে সবজি সরবরাহ তুলনামূলক কম। সব মিলিয়ে সবজির দাম বাড়তি যাচ্ছে। এ ছাড়া বেশ কিছু সবজির মৌসুম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সে কারণেও সবজির সরবরাহ কিছুটা কম। সবজির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মতো খুচরা ও ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়ে গেছে, আমাদের বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
তিনি বলেন, আগে যেই ক্রেতা এক কেজি সবজি কিনতেন, সেই ক্রেতাই এখন সেই সবজি আধা কেজি করে কিনছেন; দাম বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য। এ ছাড়া আমরাও ছোট ব্যবসায়ীরা আগে যে আইটেমের সবজি ২০ কেজি আনতাম, এখন সেই সবজি আনি ১০ কেজি। কারণ দাম বেশি, ক্রেতারাও কম কিনছে তাই। নতুন সবজি উঠলে, সবজির সরবরাহ বাড়লে আবারও সবগুলোর দাম কমে আসবে।
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটে ক্রেতা আমিনুর রহমান বলেন, বাজারে এলে মনে হয় পকেট ডাকাতি হচ্ছে। সবজির চড়া দাম শুনে যখন ডিম কিনতে গেলাম, দেখি সেখানেও আগুন। গত সপ্তাহে যে ডিম ১৩০ টাকা ডজন কিনলাম, আজ তা ১৫০ টাকা চাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এখন নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। চড়া দামের কারণে ভালো মাছ-মাংস, এমনকি সোনালি মুরগিও বাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এখন ব্রয়লার, পাঙাশ বা ডিম ভর্তাও খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দামও বাড়তি। সবজির দাম বেশি হওয়ায় মানুষ এখন ডিম বেশি কিনছে। গত দুদিনে লাফিয়ে লাফিয়ে ডিমের দাম বেড়ে এখন ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। তবে সে তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম ঠিক আছে।
একই বাজারে মাছ কিনতে আসা গৃহিণী রেহানা পারভীন বলেন, এখন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে শুধু ঘুরতে হয়, ব্যাগে ভরার মতো সাশ্রয়ী কিছু আর নেই। বাজারে মাছ-মাংসের দাম এতো বাড়ছে যে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসেনিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, একটা সংকট কাটতে না কাটতেই আরেকটা সংকট চলে আসছে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, সীমিত আয়ের মানুষ যেন জীবিকা নির্বাহে অতিরিক্ত চাপের মুখে না পড়ে।
সাননিউজ/আরএ
