এক নজরে: গ্যাসের দাম, কাঠের চুলায় ফিরছে রাজধানীর গরিব
-
সিলিন্ডারের দাম: ১২ কেজি এলপিজির সরকারি দাম ২ হাজার ৬০ টাকা, বাজারে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মার্চে সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা।
-
কারা ফিরছেন কাঠে: রাজধানীর বস্তির কম আয়ের পরিবার, যেমন ফেরিওয়ালা, অটোরিকশাচালক ও গৃহকর্মীরা।
-
মাসের খরচ: পাঁচজনের সংসারে দুটি সিলিন্ডার লাগে, খরচ প্রায় ৫ হাজার টাকা। এক নারী গৃহকর্মীর পুরো মাসের আয় আড়াই হাজার টাকা।
-
কাঠের দাম: মণ প্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এক বিক্রেতার দৈনিক বিক্রি এক-দেড় মণ থেকে বেড়ে ৭ থেকে ১০ মণ হয়েছে।
-
পাইপের গ্যাস: বাসাবাড়ির জন্য নতুন সংযোগ বন্ধ।
-
ভোগান্তি: ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, কাপড় ও ঘরে কালি।
শেরেবাংলা নগর এলাকার এক সড়কের ধারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে টিনের চালার ছোট ছোট ঘর। তারই সামনে মাটি দিয়ে বানানো চুলায় কাঠ গুঁজে আগুন ধরাচ্ছিলেন ৩২ বছরের তামান্না। গ্যাসের চুলা কেন ছাড়লেন, জানতে চাইলে তিনি বললেন, সিলিন্ডার কেনার মতো টাকা তার হাতে থাকে না।
এ চিত্র শুধু তামান্নার নয়। এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর কম আয়ের বহু পরিবার এখন রান্নার জন্য কাঠ, গাছের ডালপালা, এমনকি কাগজের ওপর ভরসা করছে। এক সময় যে চুলা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য, সেটাই এখন ফিরে এসেছে শহরের বস্তিতে।
আট মাসে হাজার টাকার ব্যবধান :
নভেম্বর মাসের জন্য এলপিজির দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সেই হিসাবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা। কিন্তু দোকানে গেলে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর মিরপুর, খিলক্ষেত, বাসাবো, খিলগাঁও, গোড়ান, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ি, কমলাপুর, বাড্ডা, তেজকুনিপাড়া, নন্দিপাড়াসহ ইত্যাদি এলাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম রাখা হচ্ছে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত।
গত মার্চে একই আকারের সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। তখন খোলা বাজারে সেটি মিলত দেড় হাজার টাকার কাছাকাছি দামে। অর্থাৎ বাজারের হিসাবে আট মাসে দাম বেড়েছে প্রায় এক হাজার টাকা।
দোকানের আয়ে চলে না সংসার :
তামান্নার পরিবারে আছেন স্বামী আর দুই সন্তান। স্বামীর সঙ্গে মিলে তারা একটি ছোট খাবারের দোকান চালান। সেখানে পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, ছোলা ও চিকেন রোলের মতো মুখরোচক খাবার বিক্রি হয়।
তামান্না জানালেন, এলাকার অনেকেই ধার-দেনা করে হলেও গ্যাস কিনছেন। কারণ, সারা দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে দ্রুত রান্না সেরে ফেলতে হয়। যাঁদের সেই সামর্থ্যও নেই, তাদের হাতে কাঠ ছাড়া আর কিছু থাকে না। সংসার চালানোই যে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেটাই বারবার বললেন তিনি।
কাঠেও কমেনি খরচ :
কাঠের চুলায় ফিরলেও খরচের হাত থেকে রেহাই মিলছে না। তামান্নার হিসাবে প্রতি কেজি কাঠের দাম পড়ছে ১৫ টাকা। এক মণ কিনতে লাগছে ৬০০ টাকা।
তামান্নার স্বামী মনির হোসেন বললেন, সব জিনিসেরই দাম বেড়ে গেছে। যেসব খাবার তারা বানিয়ে বিক্রি করেন, তার কাঁচামালের খরচ বেড়েছে, অথচ বিক্রির দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো যায় না। ফলে ঘরে টাকা আসছে কম। আক্ষেপ করে তিনি বললেন, গরিবের দিন বোধ হয় কোনো দিনই বদলাবে না।
ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, দেয়ালে কালির দাগ :
আগারগাঁওয়ের আরেক বস্তিতে থাকেন ৫০ বছরের রহিমা। অন্যের বাসায় কাজ করে একসময় সংসার চালাতেন। বয়সের ভার আর অসুস্থতায় এখন আগের মতো খাটতে পারেন না। তার রান্নাও চলে মাটির চুলায়।
প্রায় আড়াই হাজার টাকার সিলিন্ডার কেনা রহিমার পক্ষে অসম্ভব। তাই অসুবিধা জেনেও কাঠের চুলাই তার ভরসা। তিনি বললেন, আগে গ্যাসের চুলায় অল্প সময়ে রান্না শেষ করে কাজে বেরিয়ে যেতেন। এখন ধোঁয়ায় দম আটকে আসে, কাপড়ে আর ঘরের দেয়ালে কালি জমে। কাঠে রান্না করা যে কত ঝামেলার, সেটা বোঝাতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত গলায় কথা বললেন।
রহিমার দুই সন্তান। মেয়ে পোশাক কারখানার কর্মী, ছেলে অটোরিকশাচালক। প্রায় সাত মাস আগে স্বামী মারা গেছেন। তাদের আদি নিবাস ছিল ভোলায়। নদী ঘরবাড়ি আর জমি সব কেড়ে নেওয়ার পর ঢাকায় এসে কোনোমতে মাথা গুঁজেছেন তিনি।
পুরো মাসের আয়ে মেলে একটি সিলিন্ডার :
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার কয়েকটি প্লটে টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরে থাকেন ফেরিওয়ালা, অটোরিকশাচালক আর গৃহকর্মীরা। সেখানকার কিছু পরিবারও নিজেরা চুলা বানিয়ে কাঠে রান্না করছে।
সেখানকার এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, দুটি বাসায় ঘর মোছা আর কাপড় কাচার কাজ করে মাস শেষে তার হাতে আসে আড়াই হাজার টাকা। অথচ একটি সিলিন্ডার কিনতে লাগে ঠিক ততটাই। অর্থাৎ পুরো মাসের পরিশ্রমের বিনিময়ে মেলে কেবল একটিমাত্র সিলিন্ডার।
পাইপের গ্যাস নেই, বিকল্পও নেই :
বাসাবাড়ির জন্য নতুন পাইপলাইন সংযোগ এখন বন্ধ। যাঁদের আগে থেকে তিতাস গ্যাসের লাইন আছে, দুই চুলার জন্য তাদের মাসে বিল আসে ১ হাজার ৮০ টাকা। যাঁদের সেই সংযোগ নেই, তাদের একমাত্র ভরসা সিলিন্ডার।
পাঁচজনের একটি পরিবারে নিয়মিত রান্না করতে গেলে মাসে লাগে প্রায় দুটি সিলিন্ডার। তাতে খরচ গিয়ে ঠেকে পাঁচ হাজার টাকার কাছাকাছি। কম আয়ের পরিবারগুলোর পক্ষে এক দফায় এতগুলো টাকা জোগাড় করাই কঠিন। সে কারণেই তারা কাঠের চুলার দিকে ঝুঁকছে।
গ্যাস ছেড়ে কাঠের দিকে মানুষের এই ঝোঁকে চাঙা হয়েছে লাকড়ির বাজার। বিক্রেতারা জানালেন, মান ভেদে প্রতি মণে দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এখন প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
আগারগাঁওয়ের কাঠ বিক্রেতা হাফিজুর (৩৫) বললেন, সিলিন্ডারের দাম বাড়ার আগে দিনে তাঁর বিক্রি হতো এক থেকে দেড় মণ। এখন ক্রেতার ভিড়ে দিনে সাত থেকে দশ মণও বেরিয়ে যায়।
একদিকে সিলিন্ডারের দাম নাগালের বাইরে, অন্যদিকে কাঠের আগুনেও বাড়ছে খরচ আর কষ্ট। বদ্ধ ঘরে ধোঁয়ার মধ্যে রান্না করতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বস্তির এই মানুষগুলোর কাছে প্রতিদিন চুলা জ্বালানোই এখন এক বড় লড়াই।
সান নিউজ / রাজীব
