দুটি নামজারি নথি যাচাই ও প্রস্তাব দাখিলের জন্য ৬ হাজার টাকা ঘুস নেওয়ার পরও নথি দুটি খারিজ হওয়া নিয়ে জানতে চাওয়ায় এক আইনজীবীকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মোহসেনা আক্তারের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী আইনজীবী নুরুল আবছার অভিযোগ করেছেন, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে জানাবেন বললে মোহসেনা তাকে বলেন, ‘তোর যা মন চায়, তা করিস। আমার কিছু করতে পারবি না। আমি ইউএনও-এসিল্যান্ডের ধার ধারি না।’
এ ঘটনায় গত ৭ জুন পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নুরুল আবছার।
নুরুল আবছারের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে তিনি পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দুটি নামজারি খতিয়ানের জন্য আবেদন করেন। এসিল্যান্ডের কার্যালয় থেকে আবেদন দুটি যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাব দাখিলের জন্য মোহসেনা আক্তারের কাছে পাঠানো হয়।
অভিযোগে নুরুল আবছার বলেন, দুটি নামজারির প্রস্তাব দাখিলের জন্য মোহসেনা আক্তার অফিসের উম্মেদার ছৈয়দ আলমকে দিয়ে প্রতি নথির জন্য ৩ হাজার টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা দাবি করেন। চকরিয়ায় কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকায় তিনি মেয়ের মাধ্যমে ছৈয়দ আলমকে ওই টাকা দেন।
টাকা দেওয়ার পর নামজারি খতিয়ান দুটির প্রস্তাব কবে দাখিল হবে জানতে চাইলে তাকে ‘আজ-কাল’ বলে ঘোরানো হতে থাকে বলে অভিযোগ করেন নুরুল আবছার। পরে গত ৬ জুলাই তিনি মোহসেনা আক্তারের সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাব দাখিল না করার কারণ জানতে চান।
এ সময় মোহসেনা তাকে জানান, নামজারি মামলা দুটি খারিজ হয়ে গেছে। খারিজের কারণ জানতে চাইলে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে তাকে ‘দালাল’ বলে সম্বোধন করা হয় এবং জবাবদিহি করতে অস্বীকৃতি জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন নুরুল আবছার।
অভিযোগে তিনি আরও বলেন, বিষয়টি ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে জানাবেন বললে মোহসেনা আক্তার তাকে হুমকিসূচক কথা বলেন। একই সঙ্গে মোহসেনার বাড়ি অফিসের পাশে হওয়ায় তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে বারবাকিয়া বাজারে তাকে মারধরের জন্য লোকজন প্রস্তুত করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন নুরুল আবছার। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়িতে চলে যান বলে জানান।
আরও ঘুস দাবির অভিযোগ
অনুসন্ধানে নামজারি ও ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে ঘুস দাবির আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নামজারি নথি যাচাইয়ে প্রতি নথির জন্য ৩ হাজার টাকা, মিস রিভিউ মামলার প্রতিবেদনে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, এমআর মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, অংশ সংশোধনের প্রতিবেদনে ৫ হাজার টাকা এবং স্বেচ্ছায় কর্তন ও করণিক ভুল সংশোধনের প্রতিবেদনে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বড় অঙ্কের ঘুস দাবি করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, জমির অংশ বেশি হলে ঘুসের পরিমাণও বাড়ে। এসব টাকা উম্মেদার ছৈয়দ আলমের মাধ্যমে আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নেজামত উল্লাহ নামের আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, একটি খতিয়ানের নথি যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাব দাখিলের জন্য তার কাছে ১ লাখ টাকা ঘুস দাবি করা হয়েছে। এর আগে উম্মেদারের মাধ্যমে তিনি ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এরপরও প্রতিবেদন না দেওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন। পরে এসিল্যান্ড তাকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করলেও তার আরেকটি খতিয়ান এক মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উম্মেদার ছৈয়দ আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগ অস্বীকার করে ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মোহসেনা আক্তার বলেন, ‘এ অভিযোগের শুনানি হয়েছে। এটি মিথ্যা।’
তার বিরুদ্ধে আরও ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম নুরুল আকতার নিলয় বলেন, ‘মোহসেনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তার ব্যাখ্যাসহ তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি ব্যবস্থা নেবেন।’
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সান নিউজ/ হুমায়রা
