একসময় রাজধানী ঢাকার পরিচয় ছিল সবুজে ঘেরা সড়ক, ছায়াময় পরিবেশ এবং পাখির কোলাহলে মুখর সকাল। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। অব্যাহত নগরায়ন, বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক এবং কংক্রিটের অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে নগরীর গাছপালা আজ চরম সংকটে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঢাকা ভবিষ্যতে আরও উষ্ণ, দূষিত এবং বসবাসের অনুপযোগী শহরে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গাছ সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে তার শিকড়ের চারপাশে পর্যাপ্ত খোলা মাটি প্রয়োজন। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাত ও সড়কে গাছের গোড়া কংক্রিট বা পিচ দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় শিকড়ে প্রয়োজনীয় বাতাস, পানি ও পুষ্টি পৌঁছাতে পারছে না। এর ফলে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অকালেই শুকিয়ে যাচ্ছে।
শুধু মাটির সংকটই নয়, রাতজুড়ে কৃত্রিম আলোর প্রভাবও গাছের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠেছে। উচ্চক্ষমতার এলইডি ও সোডিয়াম বাতির আলোয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক দিন-রাতের জৈবিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গাছের বৃদ্ধি, ফুল-ফল উৎপাদন এবং পরিবেশের ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নতুন গাছ লাগানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার আগে বিদ্যমান গাছগুলো সংরক্ষণ করা আরও জরুরি। একটি গাছ পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে অনেক বছর সময় নেয়। তাই পরিণত গাছ হারালে সেই ক্ষতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়। এতে অক্সিজেন উৎপাদন কমে যায় এবং শহরের তাপমাত্রাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
এদিকে সরকার দেশব্যাপী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, গাছ লাগানোর পর নিয়মিত পরিচর্যা, পানি দেওয়া কিংবা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে অনেক চারাই কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এই কর্মসূচির কারিগরি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম জানান, পুরো প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি জাতীয় মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে রোপণ করা প্রতিটি গাছের অবস্থা নিয়মিত মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, গাছের রক্ষণাবেক্ষণে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও গাছের গোড়া সম্পূর্ণভাবে কংক্রিট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলে তা দ্রুত অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নাগরিকদের অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া মাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশবিদদের মতে, আধুনিক নগর পরিকল্পনায় শুধু নতুন গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়; গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে খোলা মাটি, পর্যাপ্ত পানি, আলো-বাতাস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় কংক্রিটের এই নগরীতে সবুজের অস্তিত্ব আরও সংকুচিত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং নগর জীবনের মানের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, গাছ শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়ায় না; তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুদূষণ কমানো, কার্বন শোষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে এখনই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ এবং নতুন সবুজায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
সান নিউজ/ জামান
