রাজধানীর ৮৬ দশমিক ২৩ শতাংশ বাণিজ্যিক ভবনেই নেই অনুমোদিত পার্কিং সুবিধা। ভবনের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভবনে।
সম্প্রতি রাজউকের আওতাধীন ২ হাজার ৬৩৭টি বাণিজ্যিক ভবন পরিদর্শনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিদর্শনে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১ হাজার ৭৪২টি ভবনেই কোনো পার্কিং ব্যবস্থা নেই। অনেক ভবনে নকশা অনুযায়ী নির্ধারিত পার্কিং স্থান বন্ধ করে সেখানে দোকান, গুদামসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে শিগগিরই রাজধানীতে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
রাজউক সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীর পার্কিং সংকট কমিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজউকের বিভিন্ন জোনে থাকা বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে জরিপ ও পরিদর্শন চালানো হয়। জরিপের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভবনের মালিক পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত বেজমেন্ট বা গ্রাউন্ড ফ্লোর অন্য কাজে ব্যবহার করছেন।
এর ফলে ভবনে আসা মানুষজন বাধ্য হয়ে মূল সড়কে গাড়ি পার্কিং করছেন। এতে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভবন মালিকদের সচেতন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অনেকেই নকশা অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার পর পার্কিংয়ের জায়গায় বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করেছেন। এটি ইমারত নির্মাণ বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা তালিকা চূড়ান্ত করেছি।
এখন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে খুব শিগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, তেজগাঁও, প্রগতি সরণি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পান্থপথ, কাওরান বাজার, পল্টন ও মতিঝিল এলাকা পরিদর্শন করে ৪৪টি টিম।
টিমগুলো টানা সাত দিন ২ হাজার ৬৩৭টি বাণিজ্যিক ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৮টি ভবনের পার্কিং স্থানে স্থায়ী অবকাঠামো রয়েছে। ২১৬টি ভবনে অস্থায়ী অবকাঠামো রয়েছে। ৪৫৮টি ভবনের নকশা প্রদর্শন করেননি এবং পার্কিং নেই। এ ছাড়া ৫৩২টি ভবনের পার্কিং যথাযথভাবে পার্কিং হচ্ছে এবং ৩৬৩টি ভবনে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিং সুবিধা রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা রাজউকের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক টেকসই সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, রাজউকের এই ঢিলেঢালা নজরদারির কারণেই বছরের পর বছর ধরে ভবন মালিকরা পার্কিং স্পেস বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার সাহস পেয়েছেন। এখন শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, উচ্ছেদের পর সেই জায়গাগুলো যেন পুনরায় অন্য কোনো অবৈধ দখলে না যায়, তা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। একই সঙ্গে আইন অমান্যকারী ভবন মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।
রাজধানীর যানজট নিরসনে চলতি বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, অনেক বেসরকারি ভবনের অনুমোদিত পার্কিং স্পেস নিয়মবহির্ভূতভাবে দোকান বা গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে নগরবাসী রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করতে বাধ্য হচ্ছে, যা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। সভায় রাজউক চেয়ারম্যানকে রাজধানীর ভবন ও বেজমেন্ট পার্কিংসংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজউক চারটি দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পার্কিংয়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা গত ১৫ এপ্রিলের মধ্যে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নিতে ভবন মালিক ও ব্যবহারকারীদের সময় বেঁধে দিয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের পর ১৬ এপ্রিল থেকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।
ঈদুল আজহার আগে ১৬টি বহুতল ভবনের ১৩১টি পার্কিং স্পেস থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়। রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) তার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, পার্কিংয়ের সব অনিয়ম অপসারণ করে নকশা অনুযায়ী পার্কিং নিশ্চিত করতে রাজউকের আনুমানিক আরো চার মাস সময় লাগবে। বাণিজ্যিক ভবনের পার্কিং নিশ্চিতের এই ক্রাশ প্রোগ্রাম শেষ হলেই দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোতেও একইভাবে চিরুনি অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে রাজউক সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, যানজট নিরসনে গুরুত্ব দিয়ে যেসব ভবনের পার্কিংয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে সেগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু এমন ভবনের সংখ্যা অনেক। পর্যায়ক্রমে অভিযান চলছে।
সান নিউজ/ রাব্বি
