সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এল এক ঐতিহাসিক ও নাটকীয় পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের একরোখা নীতি, অহমিকা এবং একতরফা সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হলো বর্তমান মার্কিন রিপাবলিকান প্রশাসনকে। গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত বহুকাঙ্ক্ষিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির।
বিরোধীদের প্রবল তোপের মুখে পড়ে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতাধর এই নেতার রাজনৈতিক সাম্রাজ্য এখন চরম সংকটের মুখে। নির্বাচনের ফলাফলের যে চিত্র সামনে এসেছে, তাতে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের একনায়কসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে ব্যালটের মাধ্যমেই নিজেদের কড়া বার্তা শুনিয়ে দিয়েছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া, ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয় :
নির্বাচনী ময়দানের প্রাথমিক ফলাফল এবং প্রবণতা বলছে, ১০০ আসনের মার্কিন সেনেটে ডেমোক্র্যাটরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ৫৪টি আসনে নিজেদের কব্জা করেছে। বিপরীতে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি আটকে রয়েছে মাত্র ৪৪টিতে। অন্যদিকে, ৪৩৫ আসনের শক্তিশালী হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসেও বড় ধরণের ধস নেমেছে।
সেখানে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছে একরকম অপ্রতিরোধ্য গতিতে, ২৩১টি আসন নিজেদের ঝুলিতে ভরে তারা ইতোমধ্যেই স্পর্শ করেছে ম্যাজিক ফিগার। সেখানে মাত্র ১৩৯টি আসন পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়েছে রিপাবলিকানরা। মার্কিন কংগ্রেসে এখন পুরোপুরিভাবে ডেমোক্র্যাটদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যদিও ট্রাম্পের মেয়াদের এখনও আরও প্রায় দুবছর বাকি রয়েছে, তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে হোয়াইট হাউসের এই ক্ষমতাধর নেতা এখন রীতিমতো নখদাঁতহীন বাঘে পরিণত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ভেনেজুয়েলা দখল, ইরানে আকস্মিক হামলা চালানো কিংবা একটুতেই ভারতসহ বিভিন্ন মিত্র দেশের ওপর অনৈতিক শুল্কের খড়্গ নামানোর মতো একরোখা নীতিই ডুবিয়েছে ট্রাম্পকে।
বিজয় উল্লাস ও রাজনৈতিক মহলের উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়া :
নির্বাচনেি এমন বিপর্যয়ের পর থেকেই গোটা মার্কিন মুলুকজুড়ে ডেমোক্র্যাট শিবির ও সাধারণ মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। উল্লাসের পাশাপাশি বিরোধীরাও বর্তমান প্রশাসনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে ছাড়েননি।
মার্কিন মুলুকের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেছেন, বিভাজন ও বিভেদের নোংরা রাজনীতির জাল ছিঁড়ে আজ বেরিয়ে এসেছেন সচেতন মার্কিন নাগরিকরা। জনগণ এমন একজন অভিভাবক চায়, যিনি তাদের নিত্যদিনের সমস্যার একটি স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধান দিতে সক্ষম।
আজকের এই ঐতিহাসিক জয় তারই পরিষ্কার ইঙ্গিত।’ এদিকে ভারতে ট্রাম্পের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ তকমার অন্তরালে থাকা নীতির তীব্র সমালোচনা করতে ছাড়েনি বিরোধী শিবিরও।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক ঝলক :
|
বিষয়
|
ফলাফল ও বিবরণ
|
|
সেনেট ফলাফল (১০০ আসন)
|
• ডেমোক্র্যাট: ৫৪টি আসন
• রিপাবলিকান (ট্রাম্পের দল): ৪৪টি আসন
|
|
হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (৪৩৫ আসন)
|
• ডেমোক্র্যাট: ২৩১টি আসন (সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত)
• রিপাবলিকান: ১৩৯টি আসন
|
|
ভোটের মূল কারণ
|
ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত, শুল্কনীতি, ইরানে হামলা এবং একরোখা শাসনপদ্ধতির প্রতি জনগণের ক্ষোভ
|
|
ঐতিহাসিক জয় ও পরিবর্তন
|
ক্যানসাসে ৯৪ বছরের ব্যবধান ঘুচিয়ে জয় এবং টেক্সাসসহ বিভিন্ন ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্য; সমকামী ও সংখ্যালঘু প্রার্থীর প্রথমবার জয়
|
|
ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রভাব
|
সুহাস সুব্রহ্মণ্যম, প্রমিলা জয়পাল, রো খান্না এবং পিয়া দান্ডিয়ার মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের কংগ্রেসে জোরালো উপস্থিতি
|
|
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে প্রভাব
|
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, শুল্কনীতি এবং রুশ তেল আমদানিসহ এইচ-১বি ভিসার খামখেয়ালিপনায় রাশ টানার সম্ভাবনা
|
তবে এমন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েও নিজের স্বভাবসুলভ অহংকার বজায় রেখেছেন মার্কিন ধনকুবের প্রেসিডেন্ট। পরাজয়ের পর নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে দাবি করেছেন, ‘ব্যালট পেপারে আমার নাম সরাসরি ছিল না।
যদি আমার নাম থাকত, তবে বিপুল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত ছিল।’ যদিও মুখে বিরোধী দলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার কথা বলেছেন, তবে একই সঙ্গে নিজের ‘ভেটো’ ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে বিরোধীদের কঠোর হুঁশিয়ারিও দিতে ভোলেননি তিনি।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই ভরাডুবির সমস্ত দায় চাপিয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতির ওপর। দুপুরের দিকে সংবাদমাধ্যমের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ট্রাম্পও নিজের সহকর্মীর এই অদ্ভুত যুক্তিকেই সমর্থন জানান।
ইতিহাসের ধারা বদল ও নজিরবিহীন জয় :
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প-বিরোধী হাওয়ার তীব্রতা ঠিক কতটা জোরালো ছিল, তা প্রমাণ করে কন্সাসের মতো রাজ্যে দীর্ঘ ৯৪ বছরের হারের অভিশাপ ঘুচিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের ঐতিহাসিক সেনেট জয়।
এমনকি ১৯৯৪ সাল থেকে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি বা দুর্গ হিসেবে পরিচিত টেক্সাসেও এবার বড় জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা, যেখান থেকে সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন জেমস টালারিকো।
শুধু তাই নয়, কেইশা বটমস এবং দেব হালান্ডের মতো প্রভাবশালী নারী রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সংখ্যালঘু প্রার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সমকামী প্রার্থী হিসেবে ক্রিস পাপ্পাস মার্কিন মসনদে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন।
ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের দাপট ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব :
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দিয়েছেন প্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিকরাও। সুহাস সুব্রহ্মণ্যম, প্রমিলা জয়পাল, অমি বেরা ও রো খান্নার মতো হেভিওয়েটরা দাপটের সঙ্গে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছেন।
এমনকি প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে জায়গা করে নিয়েছেন উদীয়মান ভারতীয় বংশোদ্ভূত পিয়া দান্ডিয়া। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পটপরিবর্তন ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্কনীতির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল হতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা বা স্বস্তি মিলতে পারে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিতে।
শুধু তাই নয়, এইচ-১বি ভিসার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি এবং কঠোর নীতিমালায় এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক রাশ টানবে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
সান নিউজ / রাজীব
