একসময় বর্ষা শেষে গ্রামবাংলার নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে পলো হাতে সারিবদ্ধভাবে মাছ ধরার দৃশ্য ছিল চিরচেনা। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই বিরল। নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জালের বিস্তারে দেশি মাছের সংকট বাড়ার পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসেছে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী এই লোকাচার।
এমন বাস্তবতায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বিল দাদুড়িয়ায় পলো ও হোঁচা দিয়ে মাছ ধরার উৎসবে মেতেছিলেন পাঁচ শতাধিক মানুষ। মাছ ধরার পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষাই ছিল এ আয়োজনের মূল প্রেরণা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সূর্যোদয়ের সাথে সাথে উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত বিল-দাদুড়িয়ায় এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। আগের দিন মাইকিং করে জানানো হয় উৎসবের খবর। এরপর ভোর থেকেই পলো, হোঁচা ও মাছ ধরার নানা উপকরণ হাতে বিলে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষ ও শিশুরা। কেউ এসেছেন আশপাশের গ্রাম থেকে, কেউবা কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। পানিতে নেমে দলবেঁধে মাছ ধরার চেনা দৃশ্য যেন ফিরিয়ে আনে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়।
তবে উৎসবে মানুষের উপস্থিতি থাকলেও উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশি মাছের প্রাচুর্য নিয়ে হতাশা রয়েছে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে।
তাদের অভিযোগ, কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারির মতো ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহারে খাল-বিল থেকে দেশি মাছ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী পলো দিয়ে মাছ ধরার আয়োজনেও প্রত্যাশিত মাছ মিলছে না।
তাদের মতে, জলাশয় ও দেশি মাছ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
উৎসবে অংশ নেওয়া তুষার শেখ বলেন, ছোটবেলায় পলো দিয়ে মাছ ধরেছেন। দীর্ঘদিন পর মাইকিং শুনে আবার পলো নিয়ে বিলে এসেছেন। মাছ পাওয়া বড় কথা নয়, অনেক মানুষের সঙ্গে পুরোনো দিনের মতো মাছ ধরতে পেরে আনন্দ পেয়েছেন তিনি।
দবির উদ্দিন বলেন, অনেক দিন এভাবে মাছ ধরা হয়নি। মাইকিং শুনে বিলে এসে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখে ভালো লেগেছে। প্রতিবছর এমন আয়োজন করা হলে ঐতিহ্যটি টিকে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
কুশাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গফফার শেখ বলেন- এখন আর আগের মতো বর্ষায় পানি হয়না, তারপর বিলজুড়ে ব্যক্তিগত জমিতে শতশত পুকুর খনন, নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে উৎসবে আসেন জব্বার শেখ। তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাপ-দাদাদের পলো দিয়ে মাছ ধরতে দেখেছেন। এবার জীবনে প্রথমবারের মতো এত মানুষের সঙ্গে পলো ও হোঁচা দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য দেখলেন। আয়োজনটি তার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়েছে।
অন্যদিকে পলো কিনে উৎসবে যোগ দিয়েও মাছ না পেয়ে ফিরতে হয়েছে আক্কাস আলীকে। তিনি বলেন, মাছ ধরার খবর শুনে আগের দিন পলো কিনেছেন। এখন সচরাচর পলো পাওয়া যায় না। কিন্তু বিলে দেশি মাছের সংকট থাকায় খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, চায়না দুয়ারির ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় জলাশয়গুলো মাছশূন্য হয়ে পড়ছে।
আয়োজক ইমরান মোল্লা বলেন, হারিয়ে যেতে বসা পলো ও হোঁচা দিয়ে মাছ ধরার ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক দিন আগে মাইকিং করার পর শত শত মানুষ উৎসবে যোগ দিয়েছেন। মাছ ধরা এ আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ হলেও মূল লক্ষ্য গ্রামীণ লোকঐতিহ্যকে ধরে রাখা। তার ভাষ্য, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা নিলে দেশি মাছ রক্ষা পাবে এবং খাল-বিলে মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
সাননিউজ/বান্না
