মাদারীপুরে বর্ষার আগমনীতে নৌকা তৈরি করতে ব্যস্ত সময় পাড় করছে মাদারীপুর জেলা র ৫ টি উপজেলার নৌকা তৈরীর কারিগররা। প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে বর্ষা খুব দূরে নয়। মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর ও চরগোবিন্দপুর কাঠপট্টিতে এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শোনা যায় কাঠ কাটার শব্দ, হাতুড়ির ঠকঠক আর কারিগরদের ব্যস্ত পদচারণা।অপরদিকে কালকিনি উপজেলার সাহবরামপুর বাজার ও ডাসার উপজেলার শশিকর এলাকায় কারিগররা ব্যস্ত সময় পাড় করছে।
একসময় বর্ষা মানেই ছিল নৌকার রাজত্ব। এখনও জেলার অনেক নিচু ও নদীসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে নৌকাই ভরসার নাম। তাই বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে নতুন নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কারিগররা। পাশাপাশি হাট-বাজারেও শুরু হয়েছে নৌকা বিক্রির প্রস্তুতি।
কালকিনি, ডাসার ও শিবচর উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্রতিবছর বর্ষার পানিতে প্লাবিত হয়। শশিকর, নবগ্রাম, খাসেরহাট, মোল্লারহাট, লক্ষীপুর, কুলচরী, পিরারবাড়ি ও সিডিখানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এসব অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে নৌকার প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
গোবিন্দপুরের নৌকা নির্মাতা বাদল হোসেন জানান, বছরের অধিকাংশ সময় তিনি আসবাবপত্র ও ঘরবাড়ির কাঠের কাজ করেন। তবে বর্ষা এলেই নৌকা তৈরির কাজে মনোযোগ দেন। তিনি বলেন, “এই সময়টাতে কারিগরদের দম ফেলার সুযোগ থাকে না। একজন কারিগর দিনে একটি নৌকা তৈরি করতে পারে। মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে নৌকা কিনতে আসে। তবে আগের তুলনায় চাহিদা কিছুটা কমেছে। পানি বাড়লে বিক্রিও বাড়বে বলে আশা করছি।”
বর্তমানে ৮ থেকে ১০ হাত দৈর্ঘ্যের একটি নৌকা ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকার ও কাঠের মান অনুযায়ী দাম আরও বাড়ে।
২৩ বছরের অভিজ্ঞ কারিগর ইয়াকুব মোল্লা জানান, পারিবারিকভাবে তারা কাঠমিস্ত্রির কাজের সঙ্গে জড়িত। বছরের অধিকাংশ সময় ঘর নির্মাণের কাজ করলেও বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “নৌকা বানিয়ে অন্য কাজের তুলনায় কিছুটা বেশি আয় হয়। তাই বর্ষাকালে এটি আমাদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে।”
নৌকা তৈরির এই মৌসুমি শিল্প শুধু ব্যবসা নয়, স্থানীয়দের জন্য এক ধরনের আকর্ষণও বটে। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বাচ্চু বলেন, “সারি সারি নতুন নৌকা সাজিয়ে রাখা হলে দেখতে খুব সুন্দর লাগে। অনেক মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এগুলো দেখতে আসে। যদিও সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় নৌকার ব্যবহার কমেছে, তবুও বর্ষাকালে এর প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে।”
অন্যদিকে, কাঠ ব্যবসায়ী ইমরান তালুকদার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হলে নৌকা ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারেন কারিগররা। তিনি বলেন, “পানির আশায় অনেকেই আগেভাগে নৌকা তৈরি করেছেন। কিন্তু বন্যার পানি কমে গেলে সেই নৌকা বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।”
খোয়াজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আজাদ তালুকদার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একসময় বর্ষার বিকেল মানেই ছিল পরিবার নিয়ে নৌকাভ্রমণ। তখন নদী-খাল-বিলে নৌকার চলাচল ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এখন সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের কারণে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে, ফলে নৌকার ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে।”
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব মনে করেন, নৌকা শুধু একটি বাহন নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্যেরও অংশ। তিনি বলেন, “গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।”
সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা, উন্নত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবুও বর্ষার জলরাশিতে ভেসে চলা নৌকা এখনও বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। আর সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে মাদারীপুরের কারিগররা আজও কাঠের গায়ে স্বপ্নের জলযান গড়ে চলেছেন নিঃশব্দে।
