বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম বড় সংকট এখন লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের ঘাটতি। কয়েক দশক ধরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন ইঞ্জিন যুক্ত না হওয়ায় বর্তমানে পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করেই চলছে ট্রেন পরিচালনা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ট্রেনের সময়সূচি, যাত্রীসেবা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে সচল ইঞ্জিনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অথচ একই সময়ে ট্রেনের সংখ্যা, যাত্রী পরিবহন এবং মালবাহী কার্যক্রম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যমান সচল ইঞ্জিনের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে তাদের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে, ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন রুটে একাধিক আন্তঃনগর ট্রেন কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে বাধ্য হন হাজারো যাত্রী।
কমলাপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও ট্রেন ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কেউ কেউ জানান, কয়েক ঘণ্টার যাত্রা শেষ করতে তাদের প্রায় ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।
রেল কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষ করে মিটারগেজ ইঞ্জিনের সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ না থাকায় নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
রেলওয়ের বিভিন্ন কর্মশালায় দেখা যাচ্ছে, বহু পুরোনো ইঞ্জিন মেরামত করে চালানোর চেষ্টা চলছে। তবে এসব ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বাজারে না পাওয়ায় একটি বিকল ইঞ্জিন থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইঞ্জিন সচল রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কার্যকর সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেক লোকোমাস্টারের ভাষ্য, ৫০ থেকে ৬০ বছর পুরোনো ইঞ্জিন পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। যেকোনো সময় মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
যোগাযোগ ও রেল খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের অভাবেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে শুধু যাত্রীসেবাই নয়, দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ, পুরোনো ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন এবং রেল অবকাঠামোর আধুনিকায়ন না হলে ভবিষ্যতে রেল পরিচালনা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংকট নিরসনে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩০টি নতুন লোকোমোটিভ রেল বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এগুলো পরিচালনায় আসতে পারে বলে আশা করছে সরকার।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ১৬৬টি নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ও যাত্রীদের প্রত্যাশা, এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে তবেই রেলসেবার মান উন্নত হবে এবং দীর্ঘদিনের ইঞ্জিন সংকট থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে পারবে।
