সন্তান না হলে অনেক ক্ষেত্রেই নারীর ওপর দায় চাপানো হয়। অথচ বন্ধ্যত্বের পেছনে পুরুষেরও শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া, গুণগত মানের ঘাটতি কিংবা শুক্রাণুর স্বাভাবিক চলাচলে সমস্যা দেখা দিলে সন্তান জন্মদানে জটিলতা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে পুরুষ বন্ধ্যত্ব বলা হয়।
তবে পুরুষ বন্ধ্যত্ব মানেই বাবা হওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সমস্যার কারণ ও ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই সন্তান লাভের সুযোগ তৈরি হয়। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, ওষুধ, অস্ত্রোপচার এবং আধুনিক প্রজননপ্রযুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যার চিকিৎসা করা যেতে পারে।
১. জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্ব রয়েছে। ধূমপান ও মাদক পরিহার, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে বিরত থাকা, নিয়মিত শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে মনে রাখতে হবে, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই সব ধরনের বন্ধ্যত্বের সমাধান হয় না।
২. ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণের কারণে প্রজননক্ষমতা কমে গেলে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা সম্ভব। তবে পুরুষ বন্ধ্যত্বের সব ক্ষেত্রে ওষুধ কার্যকর নয়। তাই সমস্যার কারণ শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা উচিত। নিজে থেকে ওষুধ সেবন করলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হতে পারে।
৩. অস্ত্রোপচার
পুরুষের প্রজননতন্ত্রের কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে বন্ধ্যত্ব দেখা দিতে পারে। যেমন, অণ্ডকোষের শিরা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার সমস্যা ভেরিকোসিল এবং শুক্রাণু চলাচলের পথে বাধা। এসব ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা, পরীক্ষার ফলাফল ও সন্তান লাভের সম্ভাবনা বিবেচনা করে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না।
৪. আধুনিক প্রজননপ্রযুক্তি
কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক উপায়ে সন্তান ধারণ সম্ভব না হলে সহায়ক প্রজননপ্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া যায়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক নিচের পদ্ধতিগুলোর পরামর্শ দিতে পারেন।
আইইউআই (IUI): এ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। নির্দিষ্ট কিছু বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।
ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ): পরীক্ষাগারে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। এরপর উপযুক্ত ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (আইসিএসআই): এ পদ্ধতিতে একটি শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। শুক্রাণুর সংখ্যা খুব কম হলে কিংবা শুক্রাণুর কার্যকারিতায় গুরুতর সমস্যা থাকলে এ পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
পুরুষ বন্ধ্যত্ব নিয়ে সামাজিক সংকোচের কারণে অনেকেই চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। কেউ কেউ আবার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন চিকিৎসা বা তথাকথিত টোটকার ওপর নির্ভর করেন। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হতে পারে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি হয়।
সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করার পরও প্রত্যাশিত সময়ে গর্ভধারণ না হলে নারী ও পুরুষ উভয়েরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণভাবে, এক বছর নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও গর্ভধারণ না হলে বন্ধ্যত্বের মূল্যায়ন করা উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরই মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে আগে থেকেই কোনো প্রজননস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা জানা থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
পুরুষ বন্ধ্যত্বের কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, বিশেষ করে বীর্য বিশ্লেষণ, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমস্যার ধরন অনুযায়ী ইউরোলজিস্ট, অ্যান্ড্রোলজিস্ট বা বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক দম্পতির সন্তান লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই পুরুষ বন্ধ্যত্বকে লজ্জা বা হতাশার বিষয় হিসেবে না দেখে সচেতনভাবে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সান নিউজ/ রাব্বি
