মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক আকাশজুড়ে ঘনিয়ে ওঠা যুদ্ধমেইঘের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফুটবলের আঙিনায়। চলমান সামরিক সংঘাত এবং নজিরবিহীন নিরাপত্তা সংকটের জেরে অবশেষে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। কাঙ্ক্ষিত টুর্নামেন্টের সূচি পরিবর্তন করে তা বছর শেষে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের ছায়ায় এশিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর :
সৌদি আরবের মাটিতে আসন্ন ২৪ দলের এই মহাযজ্ঞ হওয়ার কথা ছিল আগামী জানুয়ারিতে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি এবং লাগাতার লজিস্টিকস জটিলতার কারণে প্রতিযোগিতার পূর্ণাঙ্গ সূচিতে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। এএফসির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ফুটবল টুর্নামেন্ট আগামী জানুয়ারির পরিবর্তে সরাসরি শুরু হবে ডিসেম্বরের শেষের দিকে। নতুন নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী, এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই মাঠে গড়াবে ২০২৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর এবং পর্দা নামবে ২০২৮ সালের ২১ জানুয়ারি।
এর আগে মূল পরিকল্পনা ছিল, আগামী ৭ জানুয়ারি সৌদি রাজধানীর রিয়াদেই জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এশিয়ার জাতীয় দলগুলোর এই অলিম্পিকসম টুর্নামেন্টের উদ্বোধন হবে। কিন্তু ইয়েমেনের বিদ্রোহীগোষ্ঠীর লাগাতার আগ্রাসন সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রোমহর্ষক লড়াই :
গত সেপ্টেম্বর মাস থেকেই সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোকে টার্গেট করে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। রাজধানী রিয়াদের পাশাপাশি কৌশলগত বিভিন্ন শহরে মাঝেমধ্যেই আছড়ে পড়ছে ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়াবহ বিস্ফোরণ। পরিস্থিতি কতটা শোচনীয়, তার প্রমাণ মেলে গত শুক্রবারের একটি ঘটনায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সেদিন নিশ্চিত করেছে যে, পবিত্র মক্কা অঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসা একটি বিপজ্জনক বিস্ফোরকবাহী ড্রোন মাঝআকাশেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এমনকি এর আগে দেশটির পশ্চিম সীমান্তেও আরেকটি উড়ন্ত ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ভূপাতিত করার খবর পাওয়া গেছে।
ইরান সমর্থিত হুথি বাহিনী এবং রিয়াদ সমর্থিত সরকারের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব এখন এমন এক চরম সীমায় পৌঁছেছে, যা গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এশিয়ান কাপের মতো মেগা ইভেন্ট নির্ধারিত সময়ে নিরাপদে আয়োজন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে চারদিকে শুরু হয়েছিল তীব্র জল্পনা-কল্পনা।
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তীব্র উদ্বেগ ও এএফসির কূটনৈতিক চাল :
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাওয়া বিভিন্ন দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো তাদের খেলোয়াড় ও স্টাফদের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে থাকে। বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়া এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
অবশেষে স্থানীয় আয়োজক কমিটি (এলওসি) এবং সৌদি আরব ফুটবল ফেডারেশনের (এসএএফএফ) সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দীর্ঘ আলোচনার পর কঠোর এই পদক্ষেপের অনুমোদন দেয় এএফসি। সংস্থাটি এক বিশেষ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে, খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিশিয়াল, হাজার হাজার দর্শক এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সংকট এখানেই শেষ নয়। এএফসির এই একতরফা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার চূড়ান্ত সবুজ সংকেত বা অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এখন দেখার বিষয়, ফিফা এই পরিবর্তিত সূচিতে শেষ পর্যন্ত সিলমোহর বসায় কি না এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধাবস্থা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ফুটবলের অনুকূলে আসে কি না।
সান নিউজ / রাজীব
