ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসি এলাকায় তিন নারী শিক্ষার্থীকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অভিযুক্তদের দুই দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত চারজন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে টিএসসি এলাকায় রাজু ভাস্কর্যের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। পরে ভুক্তভোগী তিন নারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে হেনস্তাকারীদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাদী হয়ে মামলা করার দাবি জানানো হয়েছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার, ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মুস্তাকিম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোকলোর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীরুল ইসলাম। প্রথম দফার সংঘর্ষে অভিযুক্তদের একজনও মাথায় আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের দাবি, হেনস্তায় অভিযুক্তরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন। তারা নিজেদের ছাত্রদলের মিছিলের সঙ্গে আসা ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, তারা রাজু ভাস্কর্য এলাকা থেকে রিকশায় উঠছিলেন। এ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন যুবক তাদের উদ্দেশে অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে থাকেন। প্রতিবাদ করলে তারা আরও বাজে মন্তব্য করেন এবং রিকশাটি ঘিরে দাঁড়ান।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে অভিযুক্তরা নিজেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন বলে জানান এবং ছাত্রদলের ‘ভাই-ব্রাদার’ থাকার কথা বলেন। এরপর ফোন করে আরও লোকজন ডেকে আনা হয়।
তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো লোক জড়ো হয় এবং আমাদের ওপর হামলা করে। এই হামলায় শিমুলদা, মুস্তাকিম ভাইসহ কয়েকজন আহত হন। থামাতে গিয়ে আমিও আহত হই।’
ছাত্র ইউনিয়নের নেতা শিমুল কুম্ভকার বলেন, ঘটনার শুরুতে তিনি সেখানে ছিলেন না। নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তার প্রতিবাদে মুস্তাকিম, তানভীরসহ কয়েকজন অভিযুক্তদের কাছে গিয়ে তাদের পরিচয় ও এ ধরনের আচরণের কারণ জানতে চান। তখন তারা নিজেদের ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী নন জানিয়ে ছাত্রদলের ‘ভাই-ব্রাদার’ থাকার কথা বলেন। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি থেকে প্রথম দফায় মারামারি হয়।
তিনি বলেন, পরে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছিল। এর মধ্যে অভিযুক্তরা ফোন করে ২০ থেকে ২৫ জনকে ডেকে আনেন। তারা এসে কোনো আলোচনা ছাড়াই ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান। এতে মুস্তাকিমকে লক্ষ্য করে মারধর করা হয়। মারামারি থামাতে গিয়ে তিনিও চোখে আঘাত পান। পরে তিনি চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এদিকে, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তামজিদ হায়দার তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। ভিডিওতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রব্বানী রবিনকে ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া লোকজনকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
ঘটনার আগে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের অর্জন ও পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি মনজুরুল রিয়াদের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রব্বানী রবিন বলেন, ছাত্রদলের কর্মসূচি শেষে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। তখন সেখানে ঝামেলা দেখতে পেয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিরা ছাত্রদলের নেতাকর্মী—এ অভিযোগ অস্বীকার করে রবিন বলেন, ‘আমি তাদের চিনি না। আমি শুধু বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি।’
ঘটনার পর ছাত্রদলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসা লোকজন না হলে ক্যাম্পাসের ভেতরে ১৫ থেকে ২০ জন কীভাবে জড়ো হলেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের চিনি না।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলেন, ‘একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নাম উল্লেখ করেছেন। প্রাথমিকভাবে তাদের ফুটেজ দেখানো হয়েছে। আইনগত যে প্রক্রিয়া আছে, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সেটা সম্পন্ন করা হবে। এতে কোনো শিথিলতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই।’
সান নিউজ/ জামান
