সংখ্যার হিসেবে বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। একসময় জনসংখ্যাকে উন্নয়নের পথে বাঁধা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির অভিজ্ঞতা বলে, জনসংখ্যার আধিক্য কোনো বোঝা নয়। একটি দেশের জনসংখ্যা তখনই বোঝা হতে শুরু করে যখন মানুষ দক্ষতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।
আবার একই জনসংখ্যাই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হয় যখন তারা জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতায় যুগের সাথে মিলিয়ে এগোতে থাকে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এর State of world population 2025 প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের। যাদের বয়সসীমা ১৫-৬৪ বছরের মধ্যে। অর্থনীতির ভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় ” জনমিতিক সুবিধা বা Demographic Dividend.”
আজ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক- এই বিশাল জনগোষ্ঠী কি আমাদের শক্তি, নাকি আমরা বিপুল সম্ভাবনাময় এই জনশক্তিকে অপচয় করছি?
Demographic Dividend এমন একটা অবস্থা যখন দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে বেশি থাকে।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করেছে। এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির নতুন অধ্যায় লিখেছে।
বাংলাদেশের সামনেও এখন সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু সুযোগ কখনো চিরস্থায়ী হয় না। UNFPA এর বিশ্লেষণ বলছে- বাংলাদেশের এই জনমিতিক সুবিধার সময়কাল দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। আগামী দশকগুলোতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু সেই অর্থনীতির ভার বহন করার মতো পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মশক্তি কমতে থাকবে। অর্থাৎ এখনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে অবস্থা হয়তো আর অনুকূলে থাকবে না।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম হলেও শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর হাজার হাজার স্নাতক পাশ শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু অনেক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানই তাদের অর্জিত ডিগ্রির সাথে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে স্নাতক পাশ বেকারের সংখ্যা ৮ লক্ষ ৮৫ হাজার।
অন্যদিকে তথ্য প্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা আধুনিক সেবাখাতে দক্ষ দেশীয় জনবলের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশি জনশক্তির ওপর। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী দেশে কয়েক লক্ষ বিদেশি নাগরিক কর্মরত রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ এর বিষয় হলো শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কালে যখন প্রতিদিন প্রযুক্তি আর জীবন বদলে যাচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে, তখন কেবল পাঠ্যবই নির্ভর গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, ইংরেজি ও যোগাযোগ ক্ষমতা, বাস্তবিক সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থার যুগোপযোগী সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে দায় শুধু শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়। মানবসম্পদ উন্নয়নকে কোনো খন্ডিত বিষয় নয় বরং একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। কারণ মানবসম্পদ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া জন্মের পর থেকেই শুরু হয়ে যায়।
এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-এর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনেছে। পাশাপাশি Technical and Vocational Education and Training (TVET) সম্প্রসারণ, Skills for Employment Investment Program (SEIP) প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্প-উপযোগী প্রশিক্ষণ এবং Smart Bangladesh উদ্যোগে ডিজিটাল ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ নীতিগতভাবে ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের কার্যকারিতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও শ্রমবাজারের মধ্যে এখনো স্পষ্ট সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি পেলেও মানসম্মত কর্মসংস্থান সেই হারে বাড়ছে না।
UNFPA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের ৪১ শতাংশ তরুণ কোনো শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল না; তরুণীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৬২ শতাংশ। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় এখনো সীমিত, যা দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে এবং এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে শিল্প চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং নারীদের শ্রমবাজারে আরো বেশি অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে কার্যকর নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের উন্নয়নের আগামী অধ্যায় নির্ধারণ করবে বিশাল জনসংখ্যা নয়, সেই জনসংখ্যার গুণগত মান।
এখন তাই সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো প্রতিটি শিশুকে মানসম্মত শিক্ষা, প্রতিটি তরুণকে দক্ষতা এবং প্রতিটি নাগরিককে মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দক্ষ, সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদের অবদান অনস্বীকার্য।
শিক্ষার্থী,আইন বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
