দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে নিলামের অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক কনটেইনার এবং প্রতিদিন জমে থাকা খালি কনটেইনারের কারণে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের পরিচালনাগত সংকট। দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও শেডে প্রায় ১০ হাজার নিলামযোগ্য কনটেইনার পড়ে থাকায় মূল্যবান জায়গা দখল হয়ে আছে। পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার খালি কনটেইনারও বন্দরে অবস্থান করায় পণ্য ওঠানামা ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতির কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এক যুগের পুরোনো পণ্যও এখনো বন্দরে
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলোর অনেকগুলোই ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আমদানি করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু কনটেইনারে থাকা পণ্য এক দশকেরও বেশি সময় ধরে খালাসহীন অবস্থায় রয়েছে।
এসব কনটেইনারে গাড়ি, ফলমূল, রাসায়নিক দ্রব্য, ইলেকট্রনিকস, সিরামিক সামগ্রী, শিল্প কাঁচামাল ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যসহ নানা ধরনের আমদানিকৃত মালামাল রয়েছে। এসব পণ্যের মোট ওজন প্রায় ২ লাখ টন এবং আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
কেন বাড়ছে নিলামযোগ্য কনটেইনারের সংখ্যা?
বন্দর ও কাস্টমস সূত্রের ভাষ্য, বিভিন্ন কারণে এসব কনটেইনার বছরের পর বছর বন্দরে আটকে রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের ঘোষণায় অসঙ্গতি বা জালিয়াতির অভিযোগে কাস্টমস কনটেইনার জব্দ করেছে। আবার অনেক আমদানিকারক বাজারে দাম কমে যাওয়া বা ব্যবসায়িক লোকসানের আশঙ্কায় পণ্য আর খালাস নেননি।
এছাড়া দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা, নিলাম প্রক্রিয়ার ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের নানা কৌশলের কারণেও কনটেইনারগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।
বন্দরের সক্ষমতার বড় অংশ দখলে
বর্তমানে নিলামযোগ্য ও খালি কনটেইনার মিলিয়ে বন্দরের মোট সংরক্ষণক্ষমতার প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা দখল হয়ে আছে। এর ফলে নতুন আমদানিকৃত পণ্য সংরক্ষণ, দ্রুত খালাস এবং জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর কাজে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, জায়গার সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও ব্যাহত হতে পারে।
খালি কনটেইনার নিয়েও বাড়ছে চাপ
প্রতিদিন আমদানিকৃত পণ্য খালাসের পর বিপুলসংখ্যক কনটেইনার খালি হয়ে যায়। এর একটি অংশ বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে পাঠানো হলেও প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার খালি কনটেইনার বন্দরের ভেতরেই পড়ে থাকে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এসব খালি কনটেইনার কাস্টমস বন্ডেড এলাকার বাইরে সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হলে বন্দরের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরেও এমন ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছে।
সরকারের কাছে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান
পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে নিলাম প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কনটেইনার অপসারণের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে খালি কনটেইনার বন্ডেড এলাকার বাইরে সংরক্ষণের অনুমতি চাওয়া হয়েছে, যাতে বন্দরের অভ্যন্তরে জায়গার চাপ কমে এবং পণ্য পরিবহন কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়।
এদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে বন্দরের কার্যক্ষমতা বাড়বে, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং রাজস্ব আদায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
