উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কাজে আসছে না ঈশ্বরদী পৌর এলাকায় নির্মিত দুটি আধুনিক মার্কেট। প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘পৌর সুপার মার্কেট-২’ এবং ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘দৈনিক কাঁচা বাজার মার্কেট’ বর্তমানে অনেকটাই ফাঁকা পড়ে আছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনা দুটি চালু না হওয়ায় একদিকে নাগরিকরা আধুনিক বাজারসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে পৌরসভা। পাশাপাশি মার্কেট পাহারার জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ও হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মার্কেট দুটির অধিকাংশ দোকানেই তালা ঝুলছে। লোকসমাগম না থাকায় চারপাশে ধুলোবালি ও ময়লা-আবর্জনা জমেছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় স্থাপনাগুলোর বিভিন্ন অংশেও অযত্নের ছাপ স্পষ্ট।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট শহরের স্টেশন রোডসংলগ্ন পৌর সুপার মার্কেট-১-এর পাশে পৌর সুপার মার্কেট-২ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। আটতলা ভবনটির প্রথম তলার নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শেষ হয়। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। সেখানে ২৩টি দোকানের পাশাপাশি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
মার্কেটের দোকান বরাদ্দ দিতে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পৌরসভা। দোকানের আয়তন অনুযায়ী ১৮ থেকে ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম জামানত চাওয়া হয়। তবে জামানতের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অনেক ব্যবসায়ী দোকান নিতে আগ্রহ দেখাননি।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় ঈশ্বরদী বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দৈনিক কাঁচা বাজার মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর বাজারটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঈশ্বরদী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে হস্তান্তরের পরও বাজারটি এখনো চালু করতে পারেনি পৌর কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দুটি স্থাপনা এখন কার্যত পড়ে আছে। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের চাহিদা এবং মতামত বিবেচনা করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন জনি বলেন, পৌর সুপার মার্কেট-২ নির্মাণে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সেটি বর্তমানে কার্যত গুদামঘরের মতো পড়ে আছে। অন্যদিকে, শহরের মূল বাজার থেকে দূরে কাঁচা বাজার নির্মাণ করায় সেটিও চালু করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে দুটি প্রকল্পই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না।
শহরের বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, জনগণের অর্থে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ করলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও তার সুফল পাওয়া যায় না।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বলেন, উপজেলা ও পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই কাঁচা বাজারের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ করে বাজারটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন এটি চালু ও পরিচালনার ব্যবস্থা করা পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ঈশ্বরদী পৌরসভার সচিব জহুরুল ইসলাম বলেন, পৌর সুপার মার্কেট-২ নির্মাণের পর নিয়ম অনুযায়ী দোকান বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় মার্কেটটি চালু করা সম্ভব হয়নি। জামানতের শর্ত শিথিল করে শিগগিরই নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
দৈনিক কাঁচা বাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কী প্রক্রিয়ায় টেন্ডার করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন স্থানে বাজারটি নির্মাণ হওয়ায় চালুর ক্ষেত্রেও কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তবে অচলাবস্থা কাটাতে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে মার্কেট দুটি চালু করা হোক। এতে একদিকে যেমন পৌরসভার রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে প্রায় ১১ কোটি টাকার এই অবকাঠামো সাধারণ মানুষের কাজে লাগবে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
