ইউরেনাসের ১৩টি বলয় বিজ্ঞানীদের কাছে সব সময়ই বিস্ময়ের। জেমস ওয়েব ও হাবল টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এসব বলয়ের উৎস ও গঠন নিয়ে নতুন তথ্য পেয়েছেন, যা এ বরফশীতল গ্রহটিতে লুকানো একটি চাঁদ থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৯৭৭ সালে আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই ইউরেনাসের বিভিন্ন বলয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে পরম বিস্ময়। এগুলোর অনেক রহস্য আজও অজানা বলে প্রতিবেদনে লিখেছে নটিলাস সাময়িকী।
১৯৮৬ সালে ‘ভয়েজার ২’ প্রথমবারের মতো এ দূর গ্রহটির পাশ দিয়ে যাত্রার সময় এর আরও নতুন দুটি বলয় ধরা পড়েছে। এরপর ২০০০ সালের গোড়ার দিকে হাবল টেলিস্কোপ আরও দুটি বলয়ের সন্ধান পায়। সব মিলিয়ে ইউরেনাসের বলয় সংখ্যা এখন ১৩টি।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এসব দূরবর্তী বলয়ের উৎস নিয়ে কাজ করছেন। তাদের এ গবেষণা থেকে এমন ইঙ্গিত মেলে, এ বরফশীতল গ্রহটির ভিতরে হয়তো ‘লুকানো চাঁদ’ আছে।
সম্প্রতি কেক অবজারভেটরি, হাবল ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ইউরেনাসের সবচেয়ে বাইরের দুটি বলয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ এক গবেষণা শেষ করেছেন।
তাদের এসব নতুন তথ্য ‘জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: প্লানেটস’-এ প্রকাশ পেয়েছে।
এক বিবৃতিতে গবেষণাপত্রের লেখক ইমকে ডি প্যাটার বলেন, এসব বলয় থেকে বিচ্ছুরিত আলো বিশ্লেষণ করে আমরা এগুলোর কণার আকার ও উপাদান সম্পর্কে জানতে পারি, যেখানে এসব বলয়ের উৎস সম্পর্কে ধারণার পাশাপাশি ইউরেনাস বা এ ধরনের গ্রহগুলো কীভাবে তৈরি ও বিবর্তিত হয়েছে সে বিষয়ে আলোকপাত করেছে।
কেক ও হাবল টেলিস্কোপের আগের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গিয়েছিল, ইউরেনাসের একদম বাইরের ‘মিউ’ বলয়টি দেখতে নীল রঙের, যা শনির ‘ই’ বলয়ের মতো ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি।
অন্যদিকে, এর কিছুটা কাছে থাকা ‘নিউ’ বলয়টিতে লালচে আভা দেখা গিয়েছিল, যা থেকে ধারণা মেলে বলয়টি মহাজাগতিক ধূলিকণা দিয়ে গঠিত। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তোলা নতুন বিভিন্ন ছবি থেকে গবেষকরা এখন এসব বলয় সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে পেরেছেন।
বলয়গুলো মহাকাশের আলোর কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করছে, তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সেগুলোর উপাদান সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।
তারা বলছেন, ইউরেনাসের ‘মিউ’ বলয় থেকে পাওয়া বিভিন্ন সংকেত পুরোপুরি জমাট বাঁধা বরফের সঙ্গে মিলে যায়, অর্থাৎ বলয়টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফকণা দিয়ে তৈরি।
অন্যদিকে, ‘নিউ’ বলয়টি পাথুরে উপাদানে গঠিত, যার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জৈব যৌগ রয়েছে।
ইউরেনাসের ‘ম্যাব’ নামের চাঁদ গ্রহটিকে ঠিক সেই দূরত্বে থেকেই প্রদক্ষিণ করে, যেখানে ‘মিউ’ বলয়টি অবস্থিত। অতি ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ড যখন ম্যাবের বরফশীতল পৃষ্ঠে আঘাত করে তখন সেখান থেকে বরফকণা ছিটকে বেরিয়ে আসে এবং এ বলয়টি তৈরি করে।
বিষয়টি অনেকটা শনি গ্রহের চাঁদ ‘এনসেলাডাস’ ও তার ‘ই’ বলয়ের সম্পর্কের মতো, যা সৌরজগতের আরেকটি একমাত্র নীল বলয়। দুটি বলয়ই তাদের নিজ নিজ গ্রহ থেকে সমান দূরত্বে অবস্থিত।
তবে শনির ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, এনসেলাডাসের আগ্নেয়গিরি থেকে মহাকাশে বরফ ছিটকে আসার ফলে ওই বলয়টি তৈরি হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইউরেনাসের ‘নিউ’ বলয়টির উৎস এখনো রহস্যে ঘেরা।
বিজ্ঞানী ইমকে ডি প্যাটার বলেন, নিউ বলয়ের বিভিন্ন উপাদান সম্ভবত এমন কিছু পাথুরে বস্তু থেকে এসেছে, যা এখনো আমাদের নজরে আসেনি। এসব বস্তু জৈব উপাদানে ভরা ও পরিচিত বিভিন্ন চাঁদের মাঝখানের কোনো কক্ষপথে অবস্থান করছে। ক্ষুদ্র উল্কার আঘাত বা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে এগুলো থেকে ধূলিকণা ছিটকে বলয়টি তৈরি হয়েছে। কৌতূহল উদ্দীপক প্রশ্ন হচ্ছে, এসব বলয়ের উৎসের রাসায়নিক গঠন কেন একে অপরের থেকে এত আলাদা?
ইউরেনাসের অন্যান্য চাঁদ পাথুরে প্রকৃতির হলেও সেগুলোর কোনোটিই ‘নিউ’ বলয়ের আশপাশে অবস্থিত নয়। তাহলে কি সেখানে এমন কোনো লুকানো চাঁদ বা অন্য কোনো বস্তু আছে, যা এসব ধূলিকণা ছড়িয়ে দিচ্ছে?
আবার, ইউরেনাসকে প্রদক্ষিণ করা বিভিন্ন চাঁদের মধ্যে কেবল ‘ম্যাব’ই কেন বরফ দিয়ে তৈরি?
এসব প্রশ্ন ও আরও অনেক রহস্যের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে সুদূর গ্রহটিতে কোনো মহাকাশযান পাঠানো সময় পর্যন্ত।
সাননিউজ/আরএ
