দেশের বিপুলসংখ্যক ফিচার ফোন ব্যবহারকারীকে ডেটা নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে কম দামে স্মার্টফোন সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ডেটা স্মার্টফোনের দাম ৫০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ‘পাওয়ারিং দ্য ফিউচার: রবি কমপ্লিটস ঢাকা মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
তিনি বলেন, দেশে এখনো প্রায় অর্ধেক মোবাইল ব্যবহারকারী ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। মোট মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। এসব মানুষকে ডেটা ব্যবহারের সুযোগ দিতে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্মার্টফোন নিশ্চিত করা জরুরি।
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকলেই হবে না, সেই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের উপযোগী ডিভাইসও মানুষের হাতে থাকতে হবে। ফিচার ফোন ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সরকার মোবাইল অপারেটরদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
সাশ্রয়ী দামে স্মার্টফোন বাজারে আনতে স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকার আলোচনা করেছে বলে জানান উপদেষ্টা।
তার ভাষ্য, মোবাইল ফোন তৈরির কাঁচামালের ওপর আগে ২৬ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কর, ভ্যাট ও শুল্ক আরোপিত ছিল। সেগুলোর বড় একটি অংশ কমানো হয়েছে। কিছু উপকরণের ক্ষেত্রে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো, এসব সুবিধার সুফল যেন কম দামের ডিভাইসের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে। স্থানীয় নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনায় ৫০–৬০ ডলারের মধ্যে অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ডেটা স্মার্টফোন উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। নির্মাতারাও দ্রুত এ ধরনের ফোন তৈরিতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।
শুধু দাম কমানো নয়, গ্রাহকদের সহজ শর্তে স্মার্টফোন কেনার সুযোগ তৈরির বিষয়েও কাজ চলছে। এ জন্য মোবাইল ফোনকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইএমআই কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে স্মার্টফোন কেনায় কিস্তি সুবিধা দিতে উৎসাহিত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান উপদেষ্টা। এর ফলে এককালীন পুরো অর্থ পরিশোধ করতে না পারলেও অনেক গ্রাহকের জন্য স্মার্টফোন কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়নে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, মোবাইল অপারেটর এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রেহান আসিফ।
তিনি বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের সব সমস্যা কোনো একটি পক্ষের পক্ষে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর ও শিল্প সংগঠনগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনার লক্ষ্য ছিল পুরো খাতকে একটি অভিন্ন পরিকল্পনার আওতায় এগিয়ে নেওয়া।
তার মতে, ডেটা ও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের ওপরই টেলিযোগাযোগ খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তবে কার্যকর ডেটা সেবা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নেটওয়ার্কের পাশাপাশি গ্রাহকদের হাতে উপযুক্ত ডিভাইস পৌঁছানোও জরুরি।
অনুষ্ঠানে ঢাকার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। ভৌগোলিক আয়তনে ঢাকা দেশের একটি ছোট অংশ হলেও জনসংখ্যা ও অর্থনীতির দিক থেকে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশে পুরো দেশের সাইটের সংখ্যা ৫ হাজারের কম হলেও শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৫ হাজার সাইট রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে সাইট ব্যবস্থাপনা, স্পেকট্রাম, নেটওয়ার্কে শব্দ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাকহলসহ নানা প্রযুক্তিগত জটিলতা।
অনুষ্ঠানে রবি আজিয়াটার পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৃহত্তর ঢাকার গাজীপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ৪ হাজার ৮০০টির বেশি সাইট আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের ‘গিগা গ্রিন ৪জি/৫জি রেডি’ প্রযুক্তির সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য উপযোগী করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
রবির দাবি, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের পর বিভিন্ন ক্লাস্টারে গ্রাহক অভিজ্ঞতা সর্বোচ্চ ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হয়েছে। একই সময়ে কল ড্রপের হার কমেছে ২০ শতাংশ। বৃহত্তর ঢাকা ও গাজীপুরে ইনডোর নেটওয়ার্ক কভারেজ আগের তুলনায় তিন গুণ বেড়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি জিবি ডেটা ব্যবহারে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। রবি আজিয়াটার প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা শাহেদ আলম এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াদ সাতারাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
