এক নজরে
|
খাতের বিবরণ
|
অর্থনৈতিক বরাদ্দ ও সহযোগিতা
|
|
স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠন
|
১০০ মিলিয়ন ডলার (ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ)
|
|
বেসামরিক প্রতিরক্ষা
|
১০৫ মিলিয়ন ডলার (সক্ষমতা জোরদারকরণ)
|
|
আলেপ্পো তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র
|
৯০ মিলিয়ন ডলার (জ্বালানি সংকট নিরসন ও পুনর্বাসন)
|
|
আবাসন খাতের সংস্কার
|
৬০ মিলিয়ন ডলার
|
|
সুপেয় পানির সরবরাহ
|
৩০ মিলিয়ন ডলার (দামেস্ক ও ইদলিবে উন্নয়ন)
|
এক নজরে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন:
-
প্রতিরক্ষা চুক্তি: রিয়াদ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে একটি পৃথক ও অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
-
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোট: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত আঞ্চলিক জোটে (যেখানে এক দেশের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা) সিরিয়ার যোগ দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে জোরালোভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
-
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনীতি: লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল নিরাপদ রাখা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
-
অর্থনৈতিক সমঝোতা: নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিল্প সহযোগিতা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়েও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় ও যুগান্তকারী মোড় নিয়েছে। গতকাল বুধবার রিয়াদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার ঐতিহাসিক উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এক বিশাল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি ও চারশ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের বহুমুখী অর্থায়ন প্যাকেজ।
দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাত ও রক্তক্ষয়ের ক্ষত কাটিয়ে সিরিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিশাল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
৪০৩ মিলিয়নের আর্থিক সহায়তা ও বহুমুখী পুনর্গঠন প্রকল্প :
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ, সৌদি উন্নয়ন তহবিলের উদার অর্থায়নে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার বিভিন্ন খাতের আমূল পুনর্গঠন করা হবে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাখাতের ভেঙে পড়া কাঠামো ঠিক করতে এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০০ মিলিয়ন ডলার।
এছাড়া গৃহহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আবাসন সংস্কারে ৬০ মিলিয়ন ডলার এবং দেশের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বহুগুণ জোরদার করতে ১০৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড় করা হয়েছে।
দেশের জ্বালানি সংকট কাটাতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলেপ্পোর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্বাসনে রাখা হয়েছে ৯০ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি দামেস্ক ও ইদলিবে লাখ লাখ মানুষের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বরাদ্দ করা হয়েছে আরও ৩০ মিলিয়ন ডলার।
এই বিশাল অংকের আর্থিক সহায়তার বাইরেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে জরুরি সেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি আর্থিক পরিষেবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তরের মতো আধুনিক প্রকল্পগুলোও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তি ও নতুন আঞ্চলিক জোটে সিরিয়ার সম্ভাব্য যোগদান :
এই সফরের সবচেয়ে বড় এবং চাঞ্চল্যকর অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গোপন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। সিরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুরহাফ আবু কাসরা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট আল-শারা, সৌদি যুবরাজ এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের ত্রিমুখী উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেই এই সামরিক চুক্তিটি সম্পাদিত হয়।
যদিও চুক্তির সুনির্দিষ্ট ধারা বা শর্তাবলি নিয়ে উভয় পক্ষই চরম গোপনীয়তা বজায় রেখেছে এবং বিস্তারিত প্রকাশ থেকে বিরত রয়েছে, তবুও সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে তাদের বর্তমান কূটনীতির সবচেয়ে বড় মাইলফলক হিসেবে ঘোষণা করেছে।
শুধু দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয় দামেস্কের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশ, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত শক্তিশালী আঞ্চলিক সামরিক জোট—যা গত ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত—তাতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে সিরিয়া। ওই চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, জোটভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ মানেই তিন দেশের সকলের ওপর সম্মিলিত আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
জোটে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়ার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সম্প্রতি বাহরাইনে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ মানামা ডায়ালগ নিরাপত্তা সম্মেলনে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, মক্কা জোটে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়ন ও আলোচনা চলছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শান্তি ও ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির মুখে থাকা মিত্র দেশগুলোর প্রতি দামেস্কের এই স্পষ্ট সমর্থন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব :
বৈঠকের টেবিলে কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রভাব নিয়েও গভীর আলোচনা করেছেন দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার ডাক দিয়েছে রিয়াদ ও দামেস্ক।
নিরাপত্তা ও বিশাল অঙ্কের অর্থায়নের পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে চিরস্থায়ী ভিত্তি দিতে শিল্প সহযোগিতা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট আল-শারার এটি ছিল দ্বিতীয় রিয়াদ সফর।
এর আগে গত ৬ অক্টোবর সৌদি যুবরাজের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, যেখানে তিনি সৌদির প্রভাবশালী নেতাকে দামেস্ক সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। এই নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।
সান নিউজ / রাজীব
