লিওনেল মেসি চেয়েছিলেন, তার বিদায়ের কথাগুলো যেন শুধু একটি ঘোষণা হয়ে না থাকে; বরং জাতীয় দলের সঙ্গে তার দীর্ঘ পথচলার একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের ইতি টানার ঘোষণাটিও তাই এসেছে ভিন্ন এক আবহে। ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নিয়ে প্রকাশ করেছেন আবেগঘন একটি ভিডিও। পাশাপাশি হাতে লেখা তিন পাতার একটি বার্তায় ফুটে উঠেছে তার দীর্ঘ পথচলার গল্প।
নোটপ্যাডের তিনটি পাতায় বড় অক্ষরে নিজের হাতে বিদায়ী বার্তা লিখেছেন মেসি। সেখানে রয়েছে জাতীয় দলের হয়ে তার দুই দশকের স্মৃতি, অর্জন, হতাশা এবং ভালোবাসার কথা। শেষদিকে তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! এগিয়ে যাও আর্জেন্টিনা!’
তবে তিন পাতার সেই চিঠিতে একটি বিশেষ জিনিস আলাদা করে নজর কেড়েছে—সোনালি রঙের একটি হ্যারি পটার কলম।
সময়ের প্রতীক সেই কলম
মেসির হাতে থাকা কলমটি নিছক লেখার উপকরণ নয়। কলমটির মাথায় রয়েছে ‘টাইম-টার্নার’, যা জে. কে. রোউলিংয়ের হ্যারি পটার সিরিজে হারমায়োনি গ্রেঞ্জারের ব্যবহৃত পরিচিত একটি জাদুকরী বস্তু। এর ওপরের অংশে গোলাকার নকশার মাঝে ছোট একটি বালুঘড়িও রয়েছে।
সোনালি রঙের ধাতব বডিতে কালো অক্ষরে খোদাই করা আছে হ্যারি পটারের অফিসিয়াল লোগো। মেসি, তার স্ত্রী ও সন্তানরা হ্যারি পটার সিরিজের ভক্ত বলেও জানা যায়।
কলমটির প্রতীকী অর্থও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। হ্যারি পটারের গল্পে ‘টাইম-টার্নার’ সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতীক। আর মেসি সেই কলম দিয়েই লিখেছেন জাতীয় দলের সঙ্গে কাটানো ২০ বছরের স্মৃতি ও বিদায়ের কথা। ফলে পুরো বিষয়টির মধ্যে সময়ের একটি বিশেষ যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ ঘোষণা করার সময় মেসি যেন সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়েই নিজের গল্প লিখেছেন। যেখানে রয়েছে বছরের পর বছর সংগ্রাম, ব্যর্থতা, সমালোচনা, ফাইনালে হার এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্যের সেই স্বর্ণালি অধ্যায়—২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও ২০২২ বিশ্বকাপ জয়।
তিনটি সাধারণ নোটপ্যাডের পাতাই মেসির হাতে হয়ে উঠেছে দুই দশকের ইতিহাসের দলিল। পাতাগুলোতে সপ্তাহের দিন, তারিখ ও ছোট ছোট আইকনের জায়গা থাকলেও সেগুলো ফাঁকা রেখেছেন তিনি। কালো কালি দিয়ে বড় অক্ষরে লিখেছেন পুরো বার্তা। কোথাও কোথাও কাটাকাটি ও সংশোধনের দাগও দেখা গেছে, যা বার্তাটিকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলেছে।
প্রথম পাতায় রয়েছে বিদায়ের সিদ্ধান্তের ভার। সেখানে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার কথা জানিয়ে মেসি লিখেছেন, ‘আমি আমার সবটুকু দিয়েছি… নিজেকে একদম খালি করে দিয়েছি, আমার মধ্যে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’
দ্বিতীয় পাতায় ফিরে এসেছে তার দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি। ‘এই ২০ বছরের সব ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ’—এমন কথার মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে কাটানো সময়ের জন্য পরিবার, সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
শেষ পাতায় এসে বার্তাটি আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে মেসি লিখেছেন, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!! এগিয়ে যাও আর্জেন্টিনা।’
এভাবেই শেষ হয়েছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির দীর্ঘ গল্পের আরেকটি অধ্যায়।
বিদায়ের সঙ্গে আবেগঘন ভিডিও
হাতে লেখা চিঠির পাশাপাশি মেসি প্রকাশ করেছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত নিয়ে একটি ভিডিও। সেখানে উঠে এসেছে তরুণ বয়সে জাতীয় দলে পা রাখার সময় থেকে শুরু করে বড় বড় টুর্নামেন্ট, হতাশা, কান্না এবং শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক সাফল্যের নানা দৃশ্য।
চিঠিতে মেসি যেখানে নিজের ভাষায় দুই দশকের গল্প বলেছেন, ভিডিওতে সেই গল্পই ফুটে উঠেছে ছবির মাধ্যমে। জাতীয় দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে, সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভিডিওতে।
বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির চুক্তির সূচনালগ্নের সেই বিখ্যাত ন্যাপকিন যেমন পরে ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে, তেমনি তার বিদায়ের এই তিনটি পৃষ্ঠা ও ‘টাইম-টার্নার’ কলমটিও হয়তো ভবিষ্যতে তার ক্যারিয়ারের একটি স্মরণীয় প্রতীক হয়ে থাকবে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
