দেশের সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীনে গঠিত বিশেষ তহবিল থেকে যোগ্য উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য, নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
জামানতের ঝামেলা ছাড়াই অর্থায়নের সুযোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক মেধাবী উদ্যোক্তা কেবল ব্যাংক ঋণের কঠোর শর্ত, জামানত ও জটিল কাগজপত্রের কারণে ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেন না। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার এমন একটি অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে প্রকল্পের সম্ভাবনা মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি জানান, অর্থায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে কোনো মন্ত্রী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকবেন না। তারা উদ্যোক্তার প্রকল্প, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, সম্ভাবনা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা যাচাই করে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেবেন।
ভালো আইডিয়াই হবে মূল যোগ্যতা
অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানতে চান, যেসব তরুণ উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা রয়েছে কিন্তু ব্যাংকে জমা রাখার মতো সম্পদ বা জামানত নেই, তাদের জন্য সরকারের পরিকল্পনা কী?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, স্টার্টআপের সম্ভাবনাই হবে অর্থায়নের প্রধান ভিত্তি। প্রকল্পটি যদি উদ্ভাবনী ও বাস্তবসম্মত হয়, তাহলে নিরপেক্ষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তহবিল প্রদান করা হবে।
দ্বিতীয়বারও মিলতে পারে অর্থায়নের সুযোগ
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারি অর্থ ব্যবহারে অবশ্যই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। তবে কোনো উদ্যোক্তার প্রথম উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও যদি তার প্রকল্পে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা থাকে, তাহলে পুনরায় অর্থায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
তার ভাষায়, অনেক সফল প্রতিষ্ঠান শুরুতেই লাভজনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে না। তাই কেবল প্রথম ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, দেশের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
এই তহবিলের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, ফিনটেক, কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উদ্ভাবনী খাতে কাজ করা উদ্যোক্তারা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় স্টার্টআপ প্ল্যাটফর্ম চালু হচ্ছে
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, উদ্যোক্তাদের জন্য একটি জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম চালু করা হচ্ছে। এটি দেশের স্টার্টআপদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লঞ্চপ্যাড হিসেবে কাজ করবে।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা এক জায়গা থেকেই সরকারি অর্থায়ন কর্মসূচি, অনলাইন আবেদন, প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ, অংশীদার প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা বলেন, বাংলাদেশকে উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি এই নতুন উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। উদ্বোধনী পর্ব শেষে অনুষ্ঠানটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
