রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ এখন শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানো সম্ভব হবে এবং একই বছরের এপ্রিল থেকে যাত্রী পরিবহন শুরু করা যাবে। তবে বর্তমান কাজের গতি ও বাকি প্রযুক্তিগত কার্যক্রম বিবেচনায় সময়মতো প্রকল্প শেষ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের শুরুতে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। গত ৪২ মাসে প্রকল্পের অগ্রগতি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে আগামী কয়েক মাসে আরও দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
বর্তমানে কমলাপুর স্টেশনের মূল কাঠামো, পিয়ার, পাইলক্যাপ এবং স্টেশন কলামের নির্মাণ শেষ হয়েছে। উড়ালপথে রেললাইন বসানোর কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ওভারহেড বৈদ্যুতিক লাইনের খুঁটি স্থাপন, প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ, কনকোর্স, নিরাপত্তা দেয়াল এবং স্টেশনের ছাউনি তৈরির কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে।
স্টেশনের অভ্যন্তরে এখন টাইলস, মার্বেল, রং, কাচ স্থাপন, লিফট, এসকেলেটর, ওয়াশরুম, ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য স্থাপত্যগত ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। পাশাপাশি ট্র্যাক স্থাপন ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোও নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, সিভিল ওয়ার্কের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে সিগন্যালিং ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল ব্যবস্থা স্থাপন। এই কাজ শেষ হওয়ার পরই বিদ্যমান এমআরটি লাইন-৬-এর সঙ্গে নতুন অংশের সফল সংযোগ নিশ্চিত করা যাবে। এরপর রাতের বেলায় উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত খালি ট্রেনে পরীক্ষামূলক যাত্রা পরিচালনা করা হবে।
প্রকল্পের ইলেকট্রোমেকানিক্যাল অংশ একসময় ব্যয় বৃদ্ধি ও ঠিকাদার নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে গেলেও পরে ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি) দায়িত্ব পাওয়ার পর কাজ আবার গতি পায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সিগন্যালিং, কমিউনিকেশন ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বাস্তবায়ন করছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অবকাঠামো নয়, বরং প্রযুক্তিগত সমন্বয়। সিগন্যালিং, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক নির্ভুলভাবে বিদ্যমান লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে না পারলে নির্ধারিত সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সময়মতো দেশে পৌঁছানো, ঠিকাদারদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের আওতায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার উড়ালপথে মেট্রোরেল ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। পরে কমলাপুর পর্যন্ত অতিরিক্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার অংশ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন সময় উভয়ই সংশোধন করা হয়। বর্তমানে ব্যয় পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে দ্রুতগতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনের সঙ্গে সরাসরি দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে। এতে নগরবাসীর যাতায়াত আরও সহজ হবে, যানজট কমবে এবং রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন গতি যুক্ত হবে।
