উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করেছে। নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকার শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেল ৩টায় তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ৫২ দশমিক ১৬ মিটার রেকর্ড করা হয়। যা নির্ধারিত বিপৎসীমার চেয়ে ১ সেন্টিমিটার বেশি।
উজানের বৃষ্টিতে বেড়েছে পানির চাপ
স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের উজান অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। কয়েকদিন ধরে পানি বাড়লেও তা বিপৎসীমার নিচে ছিল। তবে মঙ্গলবারের বৃষ্টি ও নতুন ঢলের কারণে পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়।
প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল
পানি বৃদ্ধির ফলে তিস্তা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এবং চরাঞ্চলের বসতবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার নদীসংলগ্ন অনেক এলাকা ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের মতে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিতে বাঁধ ও সড়ক
নদীর পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদীতীরবর্তী উঁচু সড়কগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় এসব অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে বর্ষা মৌসুমে জরুরি মেরামতের কাজ করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না। ফলে প্রতিবছরই বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে যায়।
নদীপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ
নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরবাড়ি ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি সাপ ও বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় মানুষের উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পানি উন্নয়ন বোর্ড
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজান থেকে পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, বিকেল ৩টার হিসাব অনুযায়ী পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হয়েছে। উজানের ঢলের পরিস্থিতির ওপর পরবর্তী অবস্থা নির্ভর করবে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বন্যার সময়কালও দীর্ঘ হতে পারে।
সতর্ক থাকার আহ্বান
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে উত্তরাঞ্চলের আরও কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি ও দ্রুত ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সান নিউজ/ কেএনআই
