বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর কেবল মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়—এটি ধীরে ধীরে একটি বড় জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে দেশে বজ্রপাতের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষ।
পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ এই দুর্যোগে মারা যাচ্ছেন। উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু থাকলেও মাঠপর্যায়ে দ্রুত সতর্কতা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
হাওরাঞ্চলই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
দেশের হাওর অঞ্চল—বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজার—বজ্রপাতের অন্যতম ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, জলাভূমিনির্ভর কৃষিকাজ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ঘাটতির কারণে এসব এলাকায় মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার অনিশ্চিত আচরণ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রতি বর্গকিলোমিটারে উচ্চ বজ্রপাত প্রবণতা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে প্রায় ৮২টি বজ্রপাত ঘটে।
বিশ্বের অনেক দেশেই বজ্রপাত বেশি হলেও উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত সতর্কতা এবং নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থার কারণে সেখানে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশে বিপরীতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
দেশের মধ্যে বৈষম্যমূলক ঝুঁকি মানচিত্র
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের কিছু অঞ্চলকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং কিছু অঞ্চলকে ‘তুলনামূলক নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ: সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, সদর ও বিশ্বম্ভরপুর
- তুলনামূলক নিরাপদ: ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝিনাইদহ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং খোলা পরিবেশ এই পার্থক্যের মূল কারণ।
১২ বছরে মৃত্যু: কিছুটা কমলেও ঝুঁকি কমেনি
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ২২৬ জনের মৃত্যু হলেও ২০২০ সালে তা বেড়ে ৪২৭ জনে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কিছুটা কমে ২০২৫ সালে ২৪৩ জনে দাঁড়ায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুহার কমলেও বজ্রপাতের তীব্রতা এবং ঝুঁকি এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বিপদ
আবহাওয়াবিদদের মতে, মার্চ থেকে মে মাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী বজ্রপাত হয়। মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘটে এই সময়ে।
বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) প্রায় ৫১ শতাংশ বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ।
আগাম সতর্কতা থাকলেও মাঠে পৌঁছায় না বার্তা
বর্তমানে ১–৪ ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও মাঠপর্যায়ের মানুষ পর্যন্ত তা দ্রুত পৌঁছায় না।
হাওরাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সীমিত হওয়ায় কৃষক ও জেলেরা অনেক সময়ই আগাম সতর্কতা জানতে পারেন না।
কুসংস্কার ও ভুল ধারণাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত নিয়ে প্রচলিত অনেক কুসংস্কার এখনো গ্রামীণ সমাজে বিদ্যমান।
- মোবাইল ফোন বা ঘড়ি বজ্রপাত আকর্ষণ করে—এটি ভুল ধারণা
- রাবারের জুতা সম্পূর্ণ নিরাপদ—বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়—এটিও ভুল
বরং দ্রুত সিপিআর ও নিরাপদ স্থানে সরানো হলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
করণীয় কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বজ্রপাত শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে খোলা জায়গা ছেড়ে নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নেওয়া জরুরি। পাকা ভবন না থাকলে নিচু হয়ে বসে শরীর সংকুচিত রাখতে হবে।
এছাড়া ধাতব বস্তু, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও পানির উৎস থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
