মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ফের চরম সংঘাতের শঙ্কা দানা বাঁধছে। ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখতে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডকে (সেন্টকম) নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ ও ‘দ্য আটলান্টিক’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য।
নির্বাচনী সমীকরণ ও সম্ভাব্য টাইমলাইন
যদিও পেন্টাগনের এই নির্দেশনায় সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চূড়ান্ত কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেননি, তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রের খবর অন্য কথা বলছে। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ঠিক তার এক সপ্তাহ আগে নির্ধারিত ইসরায়েলি নির্বাচনের প্রাক্কালেই তেহরানের ওপর এই হামলা চালানো হতে পারে। অর্থাৎ যেকোনো সময় ইরানে ফের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালাতে পারে। ইরানের ওপর এবারের আসন্ন হামলা হবে ভয়াবহ। আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে, যা সরাসরি মার্কিন ভোটযুদ্ধে প্রভাব ফেলবে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের টেবিলে বিভিন্ন সামরিক বিকল্প প্রস্তুত করে রাখাটাই প্রতিরক্ষা দপ্তরের রুটিন কাজ।
ক্যাম্প ডেভিডের বৈঠক ও ট্রাম্পের শক্ত অবস্থান
গত শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে দীর্ঘক্ষণ ধরে বৈঠকে বসেছিলেন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা টিম। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ইরানে নতুন করে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনার বৈঠক বলে দাবি করেছেন। এদিকে হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা হুংকার দিয়ে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা বা ‘কার্ড’ রয়েছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এবং ইরানের অর্থনীতি ইতিমধ্যে ধসে পড়ায় ওয়াশিংটন অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তেহরানের সামনে এখন সহজ বা কঠিন—এই দুই পথের যেকোনো একটি বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
কূটনৈতিক স্থবিরতা ও নেপথ্যের কূটচাল
এদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা বর্তমানে পুরোপুরি থমকে আছে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট কিছু ছাড় পাওয়ার শর্তে ওয়াশিংটন একটি পাল্টা প্রস্তাব পাঠালেও, এখনও তার কোনো জবাব দেয়নি ইরান। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোনালাপ পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। গত সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পর নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের এই কথোপকথন নতুন কোনো সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিকেই জোরালো করছে।
ইসরায়েলি শঙ্কা ও আঞ্চলিক ঝুঁকির সমীকরণ
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবেই এই সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে অংশ নিতে পারে। তবে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ইরানি শাসকগোষ্ঠী অতীতে দুবার আকস্মিক হামলার শিকার হওয়ায় এবার নিজে থেকেই প্রতিরোধমূলক বা আগেভাগে আক্রমণ চালিয়ে বসার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলকে টার্গেট করতে পারে, যা দেশটির আসন্ন নির্বাচনকেও প্রভাবিত করবে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই চরম উত্তেজনা বা যুদ্ধের আবহ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে লাভবান করতে পারে কোণঠাসা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে, যার ফলে নির্বাচনী ময়দানে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ সাময়িক হলেও প্রশমিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব যেকোনো মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়ংকর সর্বগ্রাসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সান নিউজ / রাজীব
